একই হাওর, শিক্ষায় এত বৈষম্য কেন? বাজিতপুরে ৯৯.৬৯, নিকলীতে ২৭.৩৮ শতাংশ; তৃণমূলে জবাবদিহিতার দাবি

59 views

# আলি জামশেদ :-
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র কি শুধু জাতীয় গড়ের পাসের হার দিয়ে বোঝা যায়? নাকি সেই গড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে অঞ্চলভেদে বড় বৈষম্য? ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল সেই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এনেছে।
১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন, গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ৩ লাখ ৬৪ হাজার ১৮৪ জন, পাসের হার ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং উত্তীর্ণ ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৬৪ জন।
অন্যদিকে হাওরাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একই অঞ্চলে কোথাও পাসের হার প্রায় শতভাগ, আবার কোথাও তা নেমে এসেছে ৩০ শতাংশের নিচে। ফলে প্রশ্ন উঠছে হাওরের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে থাকার কারণ কি শুধু ভৌগোলিক প্রতিকূলতা, নাকি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী তদারকি, অভিভাবকের সম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিতার ঘাটতিও এর পেছনে কাজ করছে? নাকি অর্থনৈতিক ব্যয়ভারও জড়িত থাকে?
বাজিতপুরে সাফল্য ও বৈষম্য :
হাওরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বাজিতপুরের ২০২৬ সালের ফলাফলে দুই বিপরীত চিত্র স্পষ্ট। স্থানীয় শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ২ হাজার ২৯৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১ হাজার ৬৫৪ জন, পাসের হার ৭২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১২৩ জন।
আফতাব উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পাসের হার ৯৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৩ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে বেগম রহিমা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পাসের হার ৯৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১২ জন।
অন্যদিকে উপজেলার সর্বনিম্ন পাসের হার ২৫ শতাংশ। সাধারণ বিদ্যালয়গুলোতে পাসের হার ৭৪ শতাংশ, মাদ্রাসায় ৮২ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ। ২৮টি অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮টি বিদ্যালয় থেকে কোনো জিপিএ-৫ আসেনি।
একই ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতায় একটি প্রতিষ্ঠান যখন প্রায় শতভাগ সাফল্য পায়, তখন শুধু হাওরের প্রতিকূলতাকে দায়ী করে পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানের ফলাফলের পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন।
নিকলীতে উদ্বেগ আরও গভীর :
বাজিতপুরের পাশের হাওর উপজেলা নিকলীতে চিত্র আরও উদ্বেগজনক বলে অনেকে মন্তব্য তুলে ধরেন। স্থানীয় শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয় পর্যায়ে পাসের হার ৪৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, প্রায় ১ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১৩ জন। মাদ্রাসায় পাসের হার ৭২ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ৩১১ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে চারজন।
মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ছাতিরচর উচ্চ বিদ্যালয়ে পাসের হার ৫৬ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং কারার মাহতাবউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। জারইতলা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং রসুলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে মাত্র ২৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে ছাতিরচর দাখিল মাদ্রাসায় পাসের হার ৮৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ, নানশ্রী সিংগাড়পার আদর্শ দাখিল মাদ্রাসায় ৮৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ, বিপরীতে ডুবি শরিয়তউল্লাহ দাখিল মাদ্রাসায় ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
একই হাওর, একই উপজেলা তবু ফলাফলে এত বড় ব্যবধান কেন? হাওরের বাস্তবতা কঠিন, কিন্তু অজুহাত নয়। হাওরের ভৌগোলিক বাস্তবতা অবশ্যই শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। বর্ষায় নৌপথনির্ভর যোগাযোগ, দীর্ঘ যাতায়াত, পানি বৃদ্ধি, নৌযান সংকট ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষকসংকট, প্রত্যন্ত বিদ্যালয়ে দক্ষ শিক্ষক ধরে রাখার সমস্যা এবং অনেক পরিবারের আর্থসামাজিক সীমাবদ্ধতা।
এসব কারণে শিক্ষার্থীর নিয়মিত উপস্থিতি ও শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একই অঞ্চলের কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান যখন অসাধারণ ফল করে, তখন স্পষ্ট হয় ভৌগোলিক প্রতিকূলতা একটি কারণ, একমাত্র কারণ নয়। তাই প্রয়োজন কাঠামোগত বঞ্চনা দূর করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
দায় শুধু শিক্ষকের নয়। একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান শুধু ভালো শিক্ষক দিয়ে নিশ্চিত হয় না। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির সমন্বিত দায়িত্বশীলতা জরুরি।
প্রতিটি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, উপস্থিতি, দুর্বলতা ও অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কার্যকর গাইড টিচার ও ক্লাস টিচারের তদারকি থাকলে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীকে আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। শিক্ষক-অভিভাবকের নিয়মিত যোগাযোগও নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল ডায়েরি হতে পারে এ ব্যবস্থার কার্যকর হাতিয়ার। শিক্ষক পড়া ও বাড়ির কাজের অগ্রগতি জানাবেন, অভিভাবক তা পর্যবেক্ষণ করবেন। এতে বিদ্যালয় শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থীর মধ্যে জবাবদিহিতার সেতু তৈরি হবে। ম্যানেজিং কমিটিকে সক্রিয় হতে হবে ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্ব শুধু সভা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন কি না, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কেমন, দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য বাড়তি সহায়তা আছে কি না, শিক্ষক-অভিভাবক যোগাযোগ হচ্ছে কি না এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
প্রয়োজনে মাসিক শিক্ষার মান পর্যালোচনা সভা করা যেতে পারে। প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক প্রতিনিধি, ম্যানেজিং কমিটি ও অভিভাবক প্রতিনিধিরা বসে দুর্বলতা চিহ্নিত করে পরবর্তী মাসের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করবেন।
লক্ষ্য শুধু জিপিএ-৫ নয়। শিক্ষার সাফল্য শুধু পাসের হার বা জিপিএ-৫ দিয়ে মাপা যায় না। একজন শিক্ষার্থী কতটা বুঝতে পারছে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে পারছে কি না, সময়ের মূল্য, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা শিখছে কি না এসবও শিক্ষার সাফল্য। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ভালো মানুষ তৈরি করা।
হাওরের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ পরিকল্পনা বর্ষাকালীন যোগাযোগ, শিক্ষক ধরে রাখা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তা, নিয়মিত উপস্থিতি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ। একই সঙ্গে যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও ভালো করছে, তাদের কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। তৃণমূলের ব্যবধান কমাতেই হবে। সেক্ষেত্রে অভিযোগের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যয়ভার বিষয়েও। সেরা প্রতিষ্ঠান আর নিম্ন পর্যায়ে থাকাদের মধ্যে।
জাতীয় শিক্ষার সাফল্য রাজধানীর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ভালো ফলাফলে নির্ধারিত হয় না। প্রকৃত সাফল্যের পরীক্ষা সেই বিদ্যালয়ে, যেখানে শিক্ষক পাওয়া কঠিন, সেই শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে, যে বর্ষায় নৌকায় করে স্কুলে যায়, সেই পরিবারে, যেখানে শিক্ষার সহায়ক পরিবেশ সীমিত। তাই প্রয়োজন শুধু ফলাফল প্রকাশ নয় ফলাফলের পেছনের কারণ অনুসন্ধান।
প্রতিটি দুর্বল বিদ্যালয়ের জন্য সমস্যা চিহ্নিতকরণ, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি ও পরিমাপযোগ্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। হাওরের একটি শিশুর হাতে যখন বই থাকে, তখন তাঁর সঙ্গে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একটি অঞ্চলের সম্ভাবনা এবং একটি দেশের আগামী দিনের স্বপ্নও থাকে।
শিক্ষা কোনো ভৌগোলিক সুবিধার পুরস্কার নয়; এটি প্রত্যেক শিশুর অধিকার।
নিকলী-বাজিতপুরসহ হাওরাঞ্চলের প্রতিটি বিদ্যালয় হোক জ্ঞান, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষাকেন্দ্র। ম্যানেজিং কমিটি হোক তদারকির শক্তিশালী হাত, শিক্ষক হোন পথপ্রদর্শক, অভিভাবক হোন সহযাত্রী এবং শিক্ষার্থী হোক নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর।
জাতীয় শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন চাইলে দৃষ্টি ফেরাতে হবে ঠিক সেখানেই যেখানে ব্যবধান সবচেয়ে বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *