# মিলাদ হোসেন অপু :-
সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে প্রায় দেড় বছর আগে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের জাকির হোসেন (৩৫) নামে এক যুবক। সেখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বেশ কিছুদিন আগে ভাগ্য বদলের গল্পও করেছিলেন পরিবারের সাথে। কিন্তু ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিল তাঁর প্রাণ। ঘটনার প্রায় ১৫ দিন পর ৯ সেপ্টেম্বর বুধবার দেশে ফিরেছে জাকির হোসেনের মরদেহ।
উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে বুধবার সকাল ১১টায় তাঁর মরদেহ পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন প্রতিবেশীরাও। পরে বিকাল ৩টায় ঝগড়ারচর কবরস্থান মাঠে জাকির হোসেনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।
নিহত জাকির হোসেন কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামের মৃত রতন মিয়ার বড় ছেলে। তিনি এক কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন।
পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় প্রায় দেড় বছর আগে ধারদেনা করে প্রায় ৮ লক্ষ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় যান জাকির। পরে দেশটির আমুর অঞ্চলের সিনাফেক্স কোম্পানিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।
গত ২৫ আগস্ট রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় আমুর অঞ্চলে গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে (এজিসিসি) ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে পুরো এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাঁই হয়ে যায়। এতে ১৫ জন শ্রমিক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ভৈরবের জাকির হোসেনও ছিলেন।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই জাকিরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেননি তাঁর সহকর্মীরা। ঘটনার তিন দিন পর দুর্ঘটনাস্থল থেকে একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পরিচয় শনাক্তের মাধ্যমে সেটি জাকির হোসেনের মরদেহ বলে নিশ্চিত করা হয়।
স্বজনরা আরো জানান, গত ২৭ আগস্ট রাশিয়ায় অবস্থানরত আলী হোসেন নামে তাঁর চাচাতো ভাইয়ের মাধ্যমে জাকিরের মৃত্যুর খবর প্রথম জানতে পারে পরিবার। এরপর থেকেই মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা।
প্রায় দুই সপ্তাহের অপেক্ষার পর বুধবার জাকিরের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছায়। যে বাড়ি থেকে একদিন জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি, সেই বাড়িতেই ফিরলেন নিথর হয়ে।
পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে বারবার উঠে আসছিল জাকিরের রেখে যাওয়া স্বপ্নের কথা। ধারদেনা করে বিদেশে যাওয়া জাকির সংসারের অভাব ঘোচানোর আশায় কাজ করছিলেন। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগেই রাশিয়ার মাটিতে প্রাণ হারিয়ে ফিরতে হলো তাকে।
এ বিষয়ে নিহতের মা রোকেয়া বেগম বলেন, ৯ মাস আগে স্বামীকে হারিয়েছি। এখন ছেলেকে হারালাম। প্রায় ৮ লক্ষ টাকা ধারদেনা করে জাকির রাশিয়ায় গিয়েছিল। লক্ষ খানেক টাকা পরিশোধ করতে পেরেছিলেন। পাওনাদারকে বাকী টাকা পরিশোধ করতে চিন্তিত রয়েছি। শিশু সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন রাশিয়ার কোম্পানি থেকে ক্ষতিপূরণ পায় সে বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
নিহতের স্ত্রী রিপা বেগম বলেন, দেনার টাকা এখনো পরিশোধ হয়নি। তাঁর উপর আমার একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। আমাকে সরকার সহযোগিতা না করলে আমি কিভাবে সন্তানকে বড় করবো। রাশিয়ার কোম্পানি থেকে যদি ক্ষতি পূরণ পেতে সরকার সহযোগিতা করে তাহলে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে চলতে পারবো।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কে.এম মামুনুর রশীদ বলেন, জাকির হোসেনের মৃত্যুর বিষয়টি জেনেছি। আমি প্রশাসনিক ভাবে খবর নিচ্ছি। জাকির হোসেন যদি সরকারিভাবে রাশিয়ায় গিয়ে থাকেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও শ্রমকল্যাণ মন্ত্রণালয় বিষয়টি দেখবে। ভবিষ্যতে আর্থিক সহযোগিতারও সুযোগ রয়েছে। আমার পক্ষ থেকে ক্ষগ্রিহস্ত পরিবারকে যা যা সহযোগিতা করা দরকার তা আমি করবো।
ঋণ করে গিয়েছিলেন রাশিয়ায়, অবশেষে অগ্নিকাণ্ডে নিহত জাকিরের মরদেহ পৌঁছালো গ্রামের বাড়িতে
46 views
