# মুহাম্মদ কাইসার হামিদ :-
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও মিথ্যা সংবাদ প্রচারের প্রতিবাদে উপজেলার সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে বিএনপির নেতাকর্মীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। গত ৩ আগস্ট সোমবার সকাল ১১টার দিকে কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে ভৈরব-কিশোগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন, উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মো. মিজানুর রহমান স্বপন, সহ-সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন মেনু, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম ফুলু, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান মিঠু, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. খলিলুর রহমান খলিল, পৌর যুবদলের সভাপতি মো. জিল্লুর রহমান, জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল আলম রফিক, আচমিতা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুল হান্নান, উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি মো. শরিফুল ইসলাম, উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. তাসরিফুল হাসিব ও হাজী মাসুদুল ইসলাম বাবুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
বক্তারা দাবি করেন, কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যে প্রণোদিতভাবে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর উপজেলার আলোচিত তিনটি হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানান প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৬ জুলাই রোববার সকালে কিশোরগঞ্জ শহরের আখড়াবাজার এলাকায় কিশোরগঞ্জ সাংবাদিক ফোরাম কার্যালয়ে কটিয়াদী উপজেলার উত্তর ঝিড়ারপাড় গ্রামের বাসিন্দা ও দীর্ঘদিনের প্রবাসী মো. শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলার তদন্তে পক্ষপাতিত্ব, গাফিলতি এবং প্রভাবশালী আসামিদের আড়াল করার অভিযোগ তুলে কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি, মামলার মূল আসামিদের নাম-পরিচয় বারবার জানানো হলেও কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তাদের গ্রেপ্তার করছেন না। বরং একতরফাভাবে তদন্ত পরিচালনা করছেন।
এ অবস্থায় হত্যা মামলাটি কটিয়াদী মডেল থানা থেকে প্রত্যাহার করে পিবিআই, সিআইডি অথবা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একজন দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন তারা।
লিখিত বক্তব্য পাঠ করে নিহতের স্বজন নয়ন মিয়া জানান, দীর্ঘদিনের প্রবাসী জীবন শেষ করে মো. শফিকুল ইসলাম দেশে ফিরে অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তাঁর মোবাইল ফোনে একটি কল আসে।
ফোনে তাকে জরুরি ভিত্তিতে রসুলপুর ঈদগাহ মাঠের পাশে যেতে বলা হয়। সেখানে যাওয়ার পর সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে দুর্বৃত্তরা তাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। এ ঘটনায় নিহতের বোন বেগম বাদী হয়ে কটিয়াদী মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে পুলিশ বাবুল মিয়া নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছুরি উদ্ধার করে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, তারা জানতে পেরেছেন বাবুল মিয়ার পাশাপাশি বাদশা মিয়া, আমির হোসেন, হারুন মিয়া, মজিবুর রহমান, শুভ মিয়া ও জয় আহম্মেদ বকুলসহ আরও কয়েকজন এ হত্যাকাণ্ডে সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। পারিবারিক জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তারা দীর্ঘদিন ধরে শফিকুল ইসলামকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল বলেও অভিযোগ করা হয়।
এসব ব্যক্তির নাম ও ঠিকানা একাধিকবার ওসিকে জানানো হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে নিহতের মা আনোয়ারা বেগম বাদী হয়ে কিশোরগঞ্জ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। তারা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরাফেরা করছেন এবং মামলা চালিয়ে গেলে নিহতের পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। এছাড়া ঘটনার দিন শফিকুল ইসলামকে মোবাইল ফোনে কে ডেকে নিয়েছিল, সেটি শনাক্ত করার অনুরোধ জানানো হলেও পুলিশ তা অনুসন্ধান করেনি বলেও দাবি করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, ন্যায়বিচারের দাবিতে মানববন্ধনের উদ্যোগ নিলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। পাশাপাশি ওসির সঙ্গে অভিযুক্তদের পূর্বপরিচয় ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি তাদের পক্ষ নিয়ে তদন্ত পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ করেন স্বজনরা। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সুপার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তারা। এসময় নিহতের মা আনোয়ারা বেগম, বোন কামরুন্নাহার, সাবিকুন্নাহার এবং হত্যা মামলার বাদী বেগম উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিক মো. রাজু আহমেদ এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে ওসি সংবাদ সম্মেলনের বিষয়টি জেনে উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, কিশোরগঞ্জ নয়, ঢাকা প্রেসক্লাবে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে বলেন।
এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল, অনলাইন টিভি ও পত্রিকায় একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত এসব সংবাদ ও বিভিন্ন অপপ্রচারের প্রতিবাদে গত ৩ আগস্ট সকালে কটিয়াদীতে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে বিএনপির নেতা কর্মীরা।
অপর দিকে জানা যায়, কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান হত্যা মামলার প্রায় তিন মাস অতিবাহিত হলেও ঘটনার সাথে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে নিহতের স্বজনদের অভিযোগ। তাদের দাবি, দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় মামলাটি পরবর্তীতে পিবিআইতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এছাড়াও লোহাজুরী ইউনিয়নের পূর্বচর পাড়াতলা গ্রামে প্রকাশ্যে শতাধিক মানুষের সামনে আনোয়ার হোসেন নামে এক যুবককে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর আহত করার পর বিনা চিকিৎসায় পাঁচ ঘণ্টা বৃষ্টির পানিতে পড়ে থেকে মৃত্যুর ঘটনায় মানববন্ধন করা হয়েছিল।
অন্যদিকে জানা যায়, ওসি মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর মাদকবিরোধী অভিযানে একাধিক মাদক কারবারি ও মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করে সর্বস্তরের মানুষের প্রশংসা পেলেও এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সফলতা দেখাতে পারেননি।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, প্রবাস ফেরত মো. শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলার আসামি বাবুল মিয়া নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি করিয়েছি। বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। কটিয়াদী বাজারের ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান হত্যা মামলাটি পিবিআই তদন্ত করছে। আনোয়ার হোসেন হত্যা মামলার আসামি মহররম আলীকে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা সুনামগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছি। অপর আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। এসব হত্যার মরদেহের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

