# মোস্তফা কামাল :-
নারায়ণগঞ্জের ফতুুল্লা থানাধীন মাহমুদপুর এলাকায় সাজ্জাদ হোসেন (২৬) নামে এক ব্যক্তি চুক্তিতে বিভিন্ন গেঞ্জি কারাখার কাজ নিতেন। এরপর কিছু কর্মচারীর মাধ্যমে গেঞ্জি তৈরি করে সরবরাহ করতেন। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের গোবিন্দপুর এলাকার ১৪ বছরের এক কিশোর (মো. তুষার) তিন বছর আগে সাজ্জাদের অধীনে কাজ শুরু করে। কিছুদিন পর একই এলাকার নূরনাহার ময়না (২৬) নামে এক গৃহবধূ সেখানে গিয়ে রান্নার কাজ করতেন। তারা প্রায় তিন বছর কাজ করলেও সাজ্জাদ এক টাকাও বেতন দেননি। শুধু থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।
এক বছর কাজ করার পর কিশোরটি বাড়ি চলে আসে। তখন বেতন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাজ্জাদ তাকে আবার নিয়ে যান। এর পর থেকে সাজ্জাদ ওই কিশোরের সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক করতেন। মাস তিনেক আগে কিশোরের মা (আছমা খাতুন) ফতুুল্লায় গেলে কিশোরটি মায়ের সাথে বাড়ি চলে আসে। সাজ্জাদ তাদেরকে বাড়ি আসার ভাড়া পর্যন্ত দেননি। কিশোরের বাবা ফল ব্যবসায়ী (রফিকুল ইসলাম) বিকাশে এক হাজার টাকা পাঠালে তারা বাড়ি আসতে পারেন। মাসখানেক পর গৃহবধূ ময়নাও বাড়ি চলে আসেন। যৌন নিপীড়ণের বর্ণনা দিয়ে কিশোরটি আর ফতুুল্লায় যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। ময়নাও আর যেতে নারাজ।
তবে ওই কিশোর ও ময়না চলে আসার পর সাজ্জাদ হোসেন ফতুুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। তাতে লিখেছেন, সাজ্জাদ এবং ওই কিশোর এক সাথে সাইনবোর্ড রঘুনাথপুর এলাকার একটি গেঞ্জি কারখানায় চাকরি করেন। ময়না তাদের রান্নার কাজ করতেন। সবাই একই ভাড়া বাসায় থাকতেন। সাজ্জাদকে না জানিয়ে গত ৮ জুলাই কিশোর ও ১৩ জুলাই ময়না বাড়ি চলে আসেন। ময়না আসার সময় ওয়্যারড্রোব থেকে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা ও দুই ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করে পালিয়েছেন।
এরপর সাজ্জাদ গত ২২ জুলাই কিশোরের বাড়ি এসে তাকে নেওয়ার জন্য অনেক পীড়াপিড়ি করেছেন। কিন্তু কিশোরও যেতে রাজি হয়নি, মা-বাবাও ছেলেকে দেননি। তারা সাজ্জাদকে বলেছেন, আগে ফতুুল্লা থানার মামলা তুলে নাও, এর পর যাওয়ার কথা চিন্তা করবো। সাজ্জাদ শর্ত দেন, আগে কিশোরকে তার সাথে যেতে হবে, এর পর মামলা তুলে নেবেন। তখন সাজ্জাদকে কিশোর মুখের ওপর জানিয়ে দিয়েছে, ‘তুই আমার সাথে যা করেছিস, তোর সাথে আর আমি যাব না’। সমকালের সাথে আলাপকালে কিশোর ও তার বাবা-মা এরকমই বর্ণনা দিয়েছেন। কিশোরকে নিতে না পেরে সাজ্জাদ হোসেন হোসেনপুর থানায় ওই কিশোর, নূরনাহার ময়না, কিশোরেরর বাবা, ময়নার বাবা রশিদ মিয়া ও প্রতিবেশি খায়রুল ইসলাম ফকিরসহ অজ্ঞাত ৪-৫ জনকে আসামী করে ২৪ জুলাই একটি সাজানো মিথ্যা মামলা করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন কিশোরের মা-বাবাসহ অন্য আসামীরা।
ফতুুল্লা থানার মামলায় বলা হয়েছে, কিশোরটি বাড়ি চলে আসে ৮ জুলাই, আর ময়না আসেন ১৩ জুলাই। আবার ফতুুল্লা থানার মামলায় বলা হয়েছে, সাজ্জাদ ও কিশোর একটি গেঞ্জি কারখানায় চাকরি করেন। কিন্তু হোসেনপুর থানার মামলায় লিখেছেন, সাজ্জাদ সেখানে ব্যবসা করেন। হোসেনপুর থানার মামলায়ও দুই লাখ ২০ হাজার টাকা ও দুই ভরি স্বর্ণালংকার চুরির কথা বলা হয়েছে। মামলায় আরও বলা হয়েছে, সাজ্জাদ ফতুুল্লার সাইনবোর্ড এলাকার মো. লিমন মিয়াসহ (১৭) গত ২২ জুলাই কিশোরের বাড়ি এসে চুরি করা টাকা ও অলংকার ফেরত চান। এসময় তাদের ওপর আসামীরা হামলা করেন এবং সাজ্জাদের কাছ থেকে একটি বিভো ফোনসেট ও ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে যান। এরপর সিএনজি দিয়ে তাদেরকে সদর উপজেলার নীলগঞ্জ এলাকায় রেখে আসেন। পরদিন এলাকার লোকজন তাদেরকে কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
এদিকে গোবিন্দপুরের আসামী পক্ষ বলছে, এসব ডাহা মিথ্যা গল্প, এ ধরনের কোন ঘটনাই ঘটেনি। কিশোর ও ময়না যেতে চায় না বলে প্রতিহিংসার বশে মামলাটি করেছে। মামলা রেকর্ড করার আগে হোসেনপুর থানার ওসি মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম থানার এসআই বিজয়কে তদন্তের জন্য আসামীদের বাড়ি পাঠিয়েছিলেন। তিনি কিশোর ও পরিবারের বর্ণনা শুনে মামলার ব্যাপারে অনিহা প্রকাশ করে চলে যান। এরপর এসআই খালিদকে দিয়ে মামলা করানো হয়েছে। অথচ এসআই খালিদ ঘটনার তদন্তে এলাকাতেই যাননি। এখন আসামীদের থানা থেকে হয়রানি করা হচ্ছে। এমনকি অজ্ঞাত আসামীর সুযোগে এজাহার নামীয় আসামীদের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও হানা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
সমকালের সাথে আলাপকালে কিশোরটি জানায়, সে স্থানীয় মাদ্রাসায় হাফিজি পড়তো। ফেসবুকের মাধ্যমে তার সাথে সাজ্জাদের পরিচয়। এর সূত্র ধরেই তিন বছর আগে সাজ্জাদ তাদের বাড়ি এসে কিশোরের মাকে মা ডাকেন, বাবাকে বাবা ডাকেন। এভাবে সবাইকে ভুলিয়ে কাজ শেখানোর কথা বলে তুষারকে নিয়ে গিয়েছিলেন।
এ ব্যাপারে ফোন করলে সাজাদ হোসেন যৌন সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেন। তিনি কিশোরের সাথে ফেসবুকে পরিচয়ের কথা স্বীকার করে বলেন, তখন ফোন করে গেঞ্জি কারখানয় কাজের কথা বললে মা-বাবার সম্মতিতেই তাকে নিয়ে কাজে দেন। কাজ শেখার পর প্রথমে বেতন ছিল আট হাজার টাকা। সর্বশেষ বেতন ছিল ১২ হাজার টাকা। এসবের প্রমাণ আছে বলেও জানান সাজ্জাদ। আর ময়নাকে প্রথমে বেতন দেওয়া হতো ১০ হাজার টাকা। সর্বশেষ বেতন পেতেন ১৬ হাজার টাকা। এখন টাকা ও স্বর্ণাংকার চুরির মামলার কারণে যেতে চাচ্ছেন না। ফতুুল্লা থানা আর হোসেনপুর থানার মামলার এজাহারের তথ্যগত ভুল প্রসঙ্গে সাজ্জাদ জানান, হোসেনপুরে বসে ফতুুল্লা থানা থেকে ফোনে তথ্য নেওয়ার কারণে কিছুটা অসঙ্গতি হয়েছে।
হোসেনপুর থানার ওসি মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম বলেন, এসআই বিজয় ভিকটিমের বাড়ি গিয়ে তাদের বর্ণনা শুনে এসে আমার কাছে বললে আমি সাজ্জাদকে ফোন করলে আর আসেননি। ভিকটিম পক্ষকে খবর দিলে তারাও আসেনি। পরবর্তীতে এসে সাজ্জাদ মামলা দিলে এসআই খালেদকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

