# মিলাদ হোসেন অপু :-
ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়কের দুই পাশে রয়েছে প্রায় চার শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সড়কের পাশের লাগানো আকবর নগর বাসস্ট্যান্ড। তবে ৩ দশক ধরে বাজারটি পরিচিত পেয়েছে মিরারচর বাজার হিসেবে। ১৫ বছর আগে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবরনগর-মিরারচর বাজারের দুইপক্ষে সংঘর্ষ হলে বাজারের নামকরণের দ্বন্দ্ব সামনে আসে। তৎকালীন সময়ে ভৈরবের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বাজারটির নাম মিরারচর ও আকবরনগর বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সিদ্ধান্ত নেন। দীর্ঘদিন বাজারের মেমোতে দুই গ্রামের নামেই বাজারে নাম ব্যবহৃত হয়। বাজারে অদূরে গেল দেখা যায় আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড নামে সওজ এর সাইনবোর্ড। তিন বছর আগে সড়ক ও জনপদ বিভাগের পক্ষ থেকে লাগানো সাইনবোর্ডই দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। ফুঁসে উঠে মিরারচর গ্রামবাসী।
অপরদিকে জেলা পরিষদ থেকেও পাঁচ বছর আগে সড়কে দুই পাশে জেলা পরিষদ থেকে করা হয় আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড নামে যাত্রী ছাউনি। তিন বছর আগে সড়ক ও জনপদ বিভাগের পক্ষ থেকে সাইনবোর্ড লাগানোকে নিয়ে কেন্দ্র কর দুই গ্রামে তুমুল সংঘর্ষ হয়। ওই সময় বাজারের শতাধিক দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাট, বাড়িঘর ভাঙচুর অগ্নিসংযোগসহ দুইপক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়।
সরেজমিনে ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার আকবরনগর-মিরারচর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায় বাজারের প্রায় ৪ শতাধিক দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। আকবরনগর এলাকায় সুনসান নিরবতা। মিরারচরের এলাকায় রয়েছে উত্তেজনা।
এ সময় স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, আকবরনগর-মিরারচর বাজারের একপাশে মাইলপাশা নয়াহাটি এলাকা ও অপর পাশে নয়াকান্দা এলাকা। বাজার থেকে ১ কিলোমিটার দূরে আকবর নগরের মূল গ্রাম। বাজার থেকে আধা কিলোমিটার দূরে মিরারচর গ্রাম। তবে মাইলপাশা নয়াহাটি এলাকায় আকবর নগরের মানুষের ২ শতাধিক বসতি রয়েছে। সংঘর্ষে হত্যাকাণ্ডের পর ওই বসতিগুলোতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
এদিকে ঘটনার ৪ দিন পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডসহ বাড়িঘর ভাঙচুর করে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অভিযোগ দেয়নি দুই গ্রামের কোন পক্ষ থেকেই। ২৭ জুলাই দুই গ্রামের সংঘর্ষে মিরারচর গ্রামের দুইজন নিহতের পর থেকে মাইলপাশা নয়াহাটির আকবর নগরের বাসিন্দাদের দেড়শতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ৩০ জুলাই পর্যন্ত থেমে নেই লুটপাট। তবে লুটপাটের খবরে পুলিশ গেলে তাদের দেখে দৌড়ে পালাচ্ছে দুষ্কৃতিকারীরা।
বাজারের সবজি ব্যবসায়ী দ্বীন ইসলাম বলেন, বাজার নামকরণের আমাদের পেটে ভাত যাবে না। বাজার বন্ধ থাকলে না খেয়ে মরতে হবে। চারদিন যাবত ব্যবসা বন্ধ রয়েছে। অন্য গ্রামে ব্যবসার জন্য দৌড়ঝাঁপ করছি। আমরা চাই দ্রুত একটি সমাধানের আসুক দুই গ্রামের বাসিন্দারা।
আকবরনগর বাসস্ট্যান্ডের পর নওগাঁ বাসস্ট্যান্ড এলাকা। ওই এলাকার বাসিন্দা নবীর হোসেন। তিনি বলেন, আকবরনগর নামে সাইনবোর্ডটি লাগানো উচিৎ হয়নি। আমরা ছোটবেলা থেকেই মিরারচর হিসাবে বাজারটিকে জেনেছি। আবার বেশ কয়েক বছর যাবত আকবরনগর-মিরারচর বাসস্ট্যান্ড হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। বাজারে প্রায় ৪ শতাধিক ব্যবসায়ীদের মাঝে ২ শতাধিক আকবরনগর ও ২ শতাধিক মিরারচরের ব্যবসায়ীরা রয়েছে। বাজারের নামটা মিরারচর-আকবরনগর থাকলে ভাল হয়।
থানায় অভিযোগ দেয়া হয়নি কেন জানতে মুঠোফোনে নিহত হিরণ মিয়ার ভাই নয়ন মিয়াকে কল করলে তিনি বলেন, আমরা চেয়েছি নিরঅপরাধীরা যেন আসামি না হয়। অপরাধীদের যেন বিচার হয়। এ জন্য মামলা দায়ের করতে সময় নিয়েছি। ৩০ জুলাই রাতের মধ্যেই মামলা দায়ের করবো।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগের ভৈরবের অফিস সহকারী হারুন উর রশীদ বলেন, অফিসিয়ালভাবে বাজারটির মৌজায় আকবরনগর তাই সড়ক ও জনপদ বিভাগ আকবরনগর নামে সাইনবোর্ড টানিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা চাইলে আকবরনগর ও মিরারচর বাজার নামে সাইনবোর্ড টানানো সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, আকবরনগর বাজারে সড়কের দুই পাশে সওজ এর অনেক জায়গা রয়েছে। সড়কের মধ্য রেখা থেকে উত্তর পাশে ৫০ ফুট ও দক্ষিণ পাশে ৯৫ ফুট জায়গা দখল করে রেখেছে স্থানীয়রা। সওজ এর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলে বাজারের পরিধি কমে আসবে। এমনকি দুই পক্ষের বাজার নিয়ে মাতামাতিও কমে আসবে।
এ বিষয়ে ভৈরব থানা পুলিশ পরিদর্শক তদন্ত লিমন বোস বলেন, বাজারের নাম নিয়ে সংঘর্ষে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মিরারচর গ্রামের পাশে নায়াহাটি এলাকায় কিছু বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে। পুলিশ যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তৎপর রয়েছে। উভয় পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানা যায়, ২৬ জুলাই স্থানীয় এমপি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম দুই গ্রামের নেতৃবৃন্দদের সাথে নিয়ে নামকরণের বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। এসময় তিনি দুই গ্রামের ১০ জনকে নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটি করে তিনদিনের মধ্যে সমস্যা সমাধানে আশ্বাস দেন। প্রতিমন্ত্রীর দেয়া আশ্বাসের ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই ২৭ জুলাই সকাল সাড়ে ৭টায় ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়ক ও রেলপথের দুই পাশে দুই গ্রাম হওয়ায় আঞ্চলিক সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে দুই গ্রামের মানুষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। জেলা পুলিশ, ভৈরব র্যাব ক্যাম্পের সদস্যরাসহ ভৈরব ও কুলিয়ারচর থানা পুলিশ সদস্যরা ৬ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষে দুই গ্রামের ১০টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটসহ অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ২৮ জন ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন। এদের মধ্যে ৮ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কিশোরগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। সংঘর্ষে মিরারচর গ্রামের মাসুদ রানা ও হিরণ মিয়া টেঁটাবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
বাজারের নামকরণ নিয়ে সংঘর্ষে হত্যাকাণ্ডসহ দেড় শতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর করে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৪ দিনেও অভিযোগ নেই দুইপক্ষের
6 views
