মিঠামইনে ভূমি অফিসে ফাইল গায়েব, বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশও তোয়াক্কা নেই

66 views

# মোক্তার হোসেন গোলাপ :-
সরকার ভূমি সেবা ডিজিটাল করে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বললেও কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা ভূমি অফিসে চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। এখানে সেবা নিতে গেলে হয়রানি, মাসের পর মাস ঘোরানো আর ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না এমন অভিযোগ তুলেছেন একাধিক ভুক্তভোগী। অভিযোগ আরও গুরুতর, বিভাগীয় কমিশনারের লিখিত নির্দেশও এখানে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে।
মিঠামইন উপজেলায় এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন আহমেদের ঘটনা। এক বছর আগে প্রতিকার চেয়ে তিনি বিভাগীয় কমিশনার বরাবর লিখিত আবেদন করেন। তাঁর আবেদনের প্রেক্ষিতে বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশে শিক্ষা ও আইসিটি শাখা থেকে গত ২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে একটি নির্দেশপত্র মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তা আবার মিঠামইন উপজেলা ভূমি অফিসে কার্যকর পদক্ষেপের জন্য পাঠানো হয়।
কিন্তু ফলাফল শূন্য। ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বহুবার অফিসে এসেছি, অথচ কোনো ফল পাইনি। এখন বলা হচ্ছে বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশপত্রটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের মতো সচেতন মানুষ, উচ্চ মহলের নির্দেশ নিয়েও যদি হয়রানির শিকার হই, তাহলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা একবার ভাবুন।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অফিসে গেলে প্রথমেই শোনা যায় ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, আজ হবে, কাল হবে। অথচ চাহিদামতো টাকা দিলে একই কাজ চোখের পলকে হয়ে যায়।
অফিসের আশপাশের লোকজন বলছেন, ভূমি অফিসের নাজির ও সার্ভেয়ারকে ঘুষ না দিলে ফাইল টেবিলে পড়ে থেকে একসময় গায়েব করে ফেলা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অফিসের নাজির আকন্দ দায় চাপান সাবেক সার্ভেয়ার আবুল খায়েরের উপর। তিনি বলেন, রোজার মাসে হঠাৎ তিনি ঢাকা জেলা প্রশাসকের এলে শাখাই বদলি হয়ে যাওয়ায় এখানের কাজকর্ম ঠিকমতো হচ্ছে না। আবুল খায়ের ফাইল কোথায় রেখে গেছেন তাও জানা নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাবেক সার্ভেয়ার আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে অনেকের অভিযোগ রয়েছে। তিনি মিঠামইন ভূমি অফিসে কর্মরত থাকা অবস্থায় ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বহু অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়রা খারিজ ও মিসকেস নিয়ে আসা সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে টাকা না দিলে কাজ হাসিল হয়না বলে অভিযোগ।
ধোবাজোড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান ভূঁইয়া তাঁর ছেলের জমির সমস্যা সমাধানে আবেদন করেও এখনো প্রতিকার পাননি। তিনি এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরছেন প্রতিকারের আশায়।
স্থানীয় সাংবাদিক গোলাপ তাঁর একটি মিসকেসের আবেদন গত বছরের ৭ অক্টোবর করা হয়। ৮৮(১৩)২৫-২৬ নং মোকদ্দমা রুজু হলেও ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মতামত পাঠানোর পরও তা ফাইলবন্দি হয়ে আছে।
আওয়াল মিয়া গত ২১/১০/২০২৫ তারিখে সহকারী কমিশনারের বরাবর ৮৭৬(৯-১)২০২৩-২০২৪ নং নামজারি খারিজ রিভিউ করে আংশিক সংশোধনের আবেদন করেন। সেটিরও একই অবস্থা। এছাড়াও বিজ্ঞ ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল কিশোরগঞ্জ ৩৬৯/১৩নং মামলার রায় ডিগ্রির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব মুন্সিখানা থেকে আর এস রেকর্ড সংশোধনের আদেশের কপি উপজেলা ভূমি অফিসে গৃহীত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে কিন্তু এই আদর্শ ও তামিল করা হচ্ছে না।
সম্প্রতি ক্যামেরায় নাজির আকন্দের কথিত ঘুষ বাণিজ্যের চিত্র ধরা পড়ে। ভিডিওটি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, মিঠামইনে সব নিয়ম কাগজেই সীমাবদ্ধ। হয়রানি আর অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কারণে মানুষ ভূমি অফিসমুখী হতেই ভয় পাচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করার কথা বললেও মিঠামইনের বাস্তবতা উল্টো। বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশ অমান্য করে একজন মুক্তিযোদ্ধা পর্যন্ত হয়রানির শিকার হলে সাধারণ মানুষের ভরসা কোথায় সেই প্রশ্নই এখন হাওরবাসীর।
এ ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *