একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে জ্ঞান হারালেন বাবা

62 views

# আলি জামশেদ :-
সড়ক দুর্ঘটনায় একমাত্র উপার্জনশীল ছেলে রুবেল সূত্রধরের মৃত্যুর খবর শুনে জ্ঞান হারিয়েছেন অসুস্থ বাবা রঞ্জিত সূত্রধর। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে কিশোরগঞ্জের জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্বজনদের ভাষ্য, বর্তমানে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
একদিকে একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে পরিবারটি। অন্যদিকে ছেলের আকস্মিক মৃত্যুর শোকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বাবা। এমন মর্মান্তিক ঘটনায় নিকলীর গোবিন্দপুর গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা সদরের গোবিন্দপুর গ্রামের রঞ্জিত সূত্রধরের একমাত্র ছেলে রুবেল সূত্রধর। বাবার বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার খবর পেয়ে তাঁর চিকিৎসার জন্য গত ৭ আগস্ট শুক্রবার সকালে সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দর এলাকা থেকে বাসযোগে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন রুবেল। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথেই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ইউনিক পরিবহনের বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। দুটি বাসই ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই রুবেল সূত্রধরসহ নয়জন নিহত হন। আহত হন অন্তত ১২ জন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থাও গুরুতর বলে জানা গেছে।
রুবেলের মরদেহ নিকলীর ঐতিহাসিক ভবানীপুর শ্মশানখলায় সমাধিস্থ করার লক্ষে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু ছেলের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালেও অসুস্থ বাবা তাঁর শেষবারের মতো সন্তানের মুখ দেখার সুযোগ পাননি। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনেই জ্ঞান হারান তিনি। পরে তাকে দ্রুত জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অভাব-অনটনের পরিবারে বেড়ে ওঠা মাতৃহারা রুবেল ছিলেন মেধাবী ও পরিশ্রমী। বিএসসি পাস করার পর পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েন দূর করতে চাকরিতে যোগ দেন। কর্মজীবনে সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দর এলাকায় মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন তিনি।
চাকরির সুবাদে রংপুর বিভাগের গাইবান্ধার এক তরুণীকে বিয়ে করেন রুবেল। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সিলেটেই বসবাস করতেন। তাদের সংসারে রয়েছে দুই ছেলে। বড় ছেলের বয়স পাঁচ বছর, আর ছোট ছেলের বয়স মাত্র ছয় মাস।
রুবেলের মরদেহের সঙ্গে স্ত্রী ও দুই সন্তান গ্রামের বাড়িতে এলেও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। স্বামী হারিয়ে স্ত্রী বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। আর ছয় মাসের শিশুটি অপলক তাকিয়ে আছে বাবার নিথর দেহের দিকে। স্বজনদের এই আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
‘এখন এই পরিবারটির দেখভাল করবে কে?’
স্থানীয় এলাকাবাসীর প্রশ্ন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়া স্ত্রী ও দুই শিশুর দেখভাল এখন কে করবে? অসুস্থ বাবার চিকিৎসার ব্যয়ই বা বহন করবে কে?
স্থানীয় অনেকেই আক্ষেপ করে বলেন, এত বড় একটি মর্মান্তিক ঘটনার পরও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ পরিবারের খোঁজখবর নিতে আসেননি। এমনকি কোনো মহলের পক্ষ থেকেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে তারা দাবি করেন।
স্থানীয় শিক্ষক মোজাম্মেল হক বলেন, রুবেল অত্যন্ত মেধাবী এবং ভদ্র একটি ছেলে ছিল। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটি অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ে গেল।
ভবানীপুর শ্মশানখলায় রুবেলের স্বজন সুজন চন্দ সূত্রধর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এই দুর্ঘটনার বিচার কি অসহায় পরিবারটি পাবে, নাকি ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যাবে? এখন পর্যন্ত কোনো মহলের তৎপরতা চোখে পড়েনি।
এ বিষয়ে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেহেনা মজুমদার মুক্তির সঙ্গে সাংবাদিকের কথা হলে তিনি রুবেল সূত্রধরের পরিবারের এই মর্মান্তিক ঘটনার বিষয়ে অবগত নন বলে জানান।
একটি সড়ক দুর্ঘটনায় রুবেলের মৃত্যুতে শুধু একটি প্রাণই ঝরে যায়নি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে একটি পরিবার। বাবার চিকিৎসা, স্ত্রী ও দুই শিশুর ভবিষ্যৎ সবকিছুই এখন প্রশ্নের মুখে। স্বজন ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দুর্ঘটনার কারণ ও দায় নিরূপণের পাশাপাশি অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *