# মোস্তফা কামাল :-
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের (৫৭) ওপর যখন হামলা হয়, তখন সারা উপজেলায় বিদ্যুৎ থাকলেও তাঁর বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ঘুটঘুটে অন্ধকারে তিন ভাড়াটে খুনি অতর্কিতে হামলা চালায়। এদের দু’জন খালি হাতে গেলেও একজনের হাতে ছিল একটি ব্যাগ। ওই ব্যাগের মধ্যেই ছিল চাপাতি। এদের কারও মুখোসও পরা ছিল না। এসব কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরের সঙ্গী আহত হাদিস মিয়া (৩৮)। ঘটনার রাতেই তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। এখন জ্ঞান ফিরেছে। ফলে ১৯ জুলাই রোববার তিনি এ প্রতিবেদককে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, জাহাঙ্গীর বুধবার সকালে জেলা শহরের বত্রিশ এলাকার বাসা থেকে মিঠামইনে যান। সেখানে গিয়ে তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে একটি সভা করেন। সভাশেষে দুপুরে তিনি মিঠামইন থানায় গিয়ে কিছু সময় কাটিয়ে বাজারে নিজেদের মার্কেটে তাজুলের ফার্ণিচারের দোকানে বসে আড্ডা দেন। এটি তাঁর নিয়মিত আড্ডার জায়গা। এখান থেকে বিকালে বাসায় গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে সন্ধ্যার আগে হাদিস মিয়াকে ফোন দিয়ে বলেন, তিনি আবার বাজারে যাবেন। হাদিস মিয়া যেন তাঁর মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় যান। হাদিস মিয়ার বাসাও উপজেলা সদরেই। তিনি বাসায় গেলে লুঙ্গি পরেই জাহাঙ্গীর বাজারে গিয়ে আবার তাজুলের দোকানে বসেন। সেখান থেকে রাত সাড়ে ৯টার দিকে হাদিস মিয়ার মোটরসাইকেলে করে বাসায় যান। যাবার সময় তারা দেখতে পান, তিন যুবক জাহাঙ্গীরের বাসার দিকে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে মাঝের যুবকের হাতে একটি ব্যাগ। বাকি দু’জন খালি হাতে। এসময় অনন্যা জায়গায় বিদ্যুৎ থাকলেও বাসার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন দেখা যায়। হাদিস মিয়ার ধারণা, হামলার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল। নিকস অন্ধকারের মধ্যে বাসার গেটের সামনে জাহাঙ্গীর মোটরসাইকেল থেকে নামার সাথে সাথে তিন যুবক দৌড়ে গিয়ে চাপাতি দিয়ে কোপাতে থাকেন। জাহাঙ্গীর রাস্তায় বসে পড়ে দুই হাত দিয়ে মাথাটা রক্ষা করতে পারলেও ডান হাত প্রায় টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। বাম হাতের তিনটি আঙ্গুল বিচ্ছিন্ন হয়ে রাস্তার পড়ে থাকে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। এসময় হেলাল নামে এক খুনিকে হাদিস মিয়া জাপটে ধরে ফেলেন। তখন হেলাল তাঁর মাথা, হাত ও পায়ে চাপাতি দিয়ে আঘাত করেন। অন্য দুই যুবক তখন দৌড়ে পালিয়ে যান। এসয় হাদিস মিয়ার চিৎকার শুনে লোকজন ছুটে এসে হেলালকে চাপাতিসহ আটকে ফেলেন। তখন হাদিস মিয়া আহত অবস্থায়ই একটি রিকশায় করে জাহাঙ্গীরকে মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তখন জাহাঙ্গীর কোন কথা বলতে পারেননি। এক পর্র্যায়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে হাদিস মিয়াও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এরপর কিভাবে তাদেরকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়েছে, তা তিনি বলতে পারবেন না। পরে শুনেছেন, রাত সাড়ে ১১টার দিকে জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে এই হাসপাতালে নিয়ে আসলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এই হত্যা পরিকল্পনায় মিঠামইন উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়ক মোকাররম হোসেন খোকার নাম আসা প্রসঙ্গে হাদিস মিয়া বলেন, খোকা গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হাওরে কিছু উন্নয়নমূলক কাজের ঠিকাদারি পেয়েছিলেন। এবার কোন কাজ পাননি। সেই কারণে জাহাঙ্গীরের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। আবার খোকা আগামী ইউপি নির্বাচনে ঘাগড়া ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চান। সেখানে আবার ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নাজমুলও নির্বাচন করতে চান। নাজমুল আবার জাহাঙ্গীরের খুবই ঘনিষ্ঠ। এ কারণেও খোকা ক্ষিপ্ত ছিলেন।
তিন ভাড়াটে খুনির মধ্যে বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামের হেলাল (২৫) ঘটনাস্থলেই আটক হন। অপর দুই খুনি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার দুধরাজপুর গ্রামের মো. মহিন উদ্দিন (৩৩) ও একই উপজেলার মো. শাহিন আলম শাকিলকে (২৭) ঘটনার রাতে পালানোর সময় করিমগঞ্জের হাওর থেকে পুলিশ আটক করেছে। এরা বর্তমানে কারাগারে আছেন। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী (৫২) বাদী হয়ে শুক্রবার রাতে মিঠামইন থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে আটক তিন ভাড়াটে খুনিসহ অজ্ঞাত ১০-১২ জনকে।
মিঠামইনে জাহাঙ্গীর হত্যা ব্ল্যাকআউটে, তিন খুনির একজন যায় হাতে একটি ব্যাগ নিয়ে
49 views
