# মুহাম্মদ কাইসার হামিদ :-
আজকের দিনে যখন দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকতা পেশা নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা চলছে, ঠিক তখনই একজন শিক্ষকের আদর্শ ও নিঃস্বার্থ ত্যাগ অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে। তিনি আর কেউ নন কুলিয়ারচরের ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্মীপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক শ্রী কাজল কুমার মোদক।
একজন ভালো শিক্ষক শুধু বইয়ের অঙ্ক শেখান না, তিনি শেখান জীবনের হিসাবও-শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে ফেরা এই প্রবাদটিই যেন শতভাগ সত্যি করে তুলেছেন এই গুণী শিক্ষক।
বর্তমান যুগে অনেকেই যখন শুধু ক্লাসের গণ্ডি শেষ করে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে মেতে ওঠেন, সেখানে কাজল কুমার মোদক স্যার প্রতিটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন; বরং একাধারে অনুপ্রেরণা, শৃঙ্খলা আর কঠোর পরিশ্রমের এক জীবন্ত উদাহরণ।
কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার রামদী ইউনিয়নের আগরপুর মোদক পাড়া গ্রামের স্বর্গীয় নরেন্দ্র চন্দ্র মোদকের সুযোগ্য সন্তান কাজল কুমার মোদক। ১৯৯২ সালে তিনি প্রথমে নিজ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্মীপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরে ১৯৯৩ সালে বিধি মোতাবেক নিয়োগের মাধ্যমে ওই বিদ্যালয়ে ক্লার্ক (করণিক) হিসেবে যোগদান করেন। তবে পদের চেয়েও তাঁর ভেতরের শিক্ষক সত্তাটি ছিল প্রবল। সৎ ও নিষ্ঠার সাথে নিজ অফিসিয়াল দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত বিভিন্ন ক্লাসে গিয়ে গণিত বিষয়ে পাঠদান করতেন।
বিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বø্যাকবোর্ডে চক-ডাস্টার হাতে তাঁর লেখা প্রতিটি সূত্রের সাথে মিশে থাকত অসীম ধৈর্য, ভালোবাসা আর গভীর দায়িত্ববোধ। কঠিন ও জটিল সব অঙ্ককে সহজ ও সাবলীলভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করার এক জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্যামিতি বা বীজগণিতের সমীকরণই নয়, তিনি শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছেন জীবনের কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার মূলমন্ত্র। ২০১২ সালে তিনি স্বইচ্ছায় লক্ষ্মীপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের চাকরি থেকে বিদায় নিলেও, শিক্ষার্থীদের মন থেকে কখনোই মুছে যাননি।
বিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়ার আগেই, ২০০৮ সালে আরও কয়েকজন শিক্ষককে সাথে নিয়ে নিজ এলাকা আগরপুর বাসস্ট্যান্ডে তিনি গড়ে তোলেন দিশারী প্রি-ক্যাডেট স্কুল নামে একটি নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এখানেই অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে কোমলমতি শিশুদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছেন তিনি।
শুধু সমাজের সন্তানদেরই নয়, নিজের সন্তানদেরও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলেছেন এই আদর্শ পিতা। তাঁর বড় ছেলে শুভ মোদক বর্তমানে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (প্যাথলজি) হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট ছেলে অন্তর মোদক বেসরকারিভাবে ডিপ্লোমা নার্সিং সম্পন্ন করেছেন এবং একমাত্র মেয়ে তিথি রানী মোদক’কে অনার্স সম্পন্ন করিয়ে সুপাত্রে বিয়ে দিয়েছেন।
লক্ষ্মীপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে বলেন, এমন শিক্ষক সত্যিই আমাদের বিদ্যালয়ের জন্য গর্বের ছিলেন। স্যার, আপনার প্রতি আমাদের সম্মান ও ভালোবাসা সবসময় থাকবে। আপনার মতো মানুষরাই সমাজে শিক্ষার প্রকৃত আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলের মতে, কাজল কুমার মোদকের মতো আদর্শ শিক্ষকরাই সমাজের প্রকৃত আলোকবর্তিকা। আজকের নৈতিক অবক্ষয়ের যুগে তাঁর এই নিঃস্বার্থ অবদান ও আদর্শ ধরে রাখতে পারলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজ আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
শুধু বইয়ের অঙ্ক নয়, জীবনের হিসাবও শেখাতেন আদর্শ শিক্ষক শ্রী কাজল কুমার মোদক
196 views
