# মোস্তফা কামাল :-
৭ জুলাই। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহের পাশে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ১০ বছর। ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ছিল ঈদুল ফিতর। এদিন সকাল পৌনে ৯টার দিকে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রায় ২০০ গজ উত্তর-পশ্চিম কোণে পুলিশের চেকপোস্টে জঙ্গিদের হামলায় আনসারুল হক ও জহিরুল ইসলাম নামে দুই পুলিশ কনস্টেবল ও এলাকার গৃহবধূ ঝর্ণা রাণী ভৌমিক মারা গেয়েছিলেন। আবির রহমান নামে এক জঙ্গিও পুলিশের পাল্টা গুলিতে নিহত হয়েছিলেন।
৭ জুলাই সোমবার কথা হয় নিহত ঝর্ণা রাণী ভৌমিকের একমাত্র ঔরসজাত সন্তান শুভদেব ভৌমিকের সাথে। জঙ্গি হামলার সময় শুভদেব ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। এখন তিনি পটুয়াখালীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে ৪র্থ সেমেস্টারে পড়ছেন। শুভদেব জানান, তার বাবা গৌরাঙ্গনাথ ভৌমিকের খুব আশা ছিল, ঝর্ণা ভৌমিকের হত্যার বিচার দেখে
যাবেন, পারেননি। ২০২৪ সালের ১৮ জুন তিনি মারা গেছেন। মামলার এখনও সাক্ষ্য গ্রহণই শেষ হয়নি। শুভদেব আশায় বুক বেঁধে আছেন, মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং দোষী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে।
শোলাকিয়া হামলার মাত্র এক সপ্তাহ আগে ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়েছিল। যে কারণে শোলাকিয়া ঈদগাহের লাখ লাখ মুসল্লির জামাতকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছিল বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঈদগাহের প্রতিটি প্রবেশ পথে বসানো হয় পুলিশের চেকপোস্ট। এদিন সকালে ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কুমিল্লার সন্তান আবির রহমান (২৩) ও গাইবান্ধার মাদ্রাসা ছাত্র শফিউল ইসলাম (২২) ব্যাগের মধ্যে রিভলবার, হ্যান্ড গ্রেনেড ও প্যান্টের বিশেষ ধরনের পকেটে চাপাতি নিয়ে শোলাকিয়া ঈদগাহের দিকে যেতে থাকেন। কিন্তু ঈদগাহের ২০০ গজ দূরে আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের চেকপোস্টে তাদের ব্যাগ তল্লাশির সময় জঙ্গিরা ব্যাগ থেকে গ্রেনেড বের করে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটান। এসময় পুলিশ সদস্যরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে পুলিশ সদস্য আনসারুল হক ও জহিরুল ইসলামকে হত্যা করা হয়। আহত হন আরও অন্তত ১০ পুলিশ সদস্য।
এসময় আশপাশের অন্য চেকপোস্টের পুলিশ সদস্যরা এসে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ চলে বন্দুকযুদ্ধ। এক পর্যায়ে আবির রহমান নামে এক জঙ্গি সেখানে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। উভয় পক্ষের গুলি বিনিময়ের সময় ওই এলাকার নিজ বাসায় জানালা ভেদ করে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝর্ণা রাণী ভৌমিক মারা যান। সেদিন বুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অপর জঙ্গি শফিউল ইসলাম রিভলবারসহ আটক হন। একই এলাকা থেকে কিশোরগঞ্জ শহরের মনিপুরঘাট এলাকার যুবক জাহিদুল হক তানিমও (৩৩) আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন। তদন্তে জঙ্গিদের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তবে জঙ্গিদের আগেই আটকে দেবার ফলে ঈদের জামাত নির্ধারিত সময় সকাল ৯টায় নিরাপদেই সম্পন্ন হয়েছিল।
এ হামলার ঘটনায় সেদিন চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকারী পাকুন্দিয়া থানার তখনকার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. শামসুদ্দিন বাদী হয় ১০ জুলাই কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় সন্ত্রাস দমন আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলা করেছিলেন। প্রথমে কেবল শফিউল ইসলাম ও জাহিদুল হক তানিমকে আসামি করা হয়। পরবর্তীতে তদন্ত করে মোট ২৪ জনকে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় এনকাউন্টারে শফিউল ইসলামসহ ১৯ জন আসামি মারা যান। শেষ পর্যন্ত জাহিদুল হক তানিম ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় মিজান (৬৮), রাজিব গান্ধী (৩৭), সোহেল মাহফুজ (৪২) ও আনোয়ার হোসেন (৫৪) নামে আরও চারজনকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আটক করে।
মামলার আইনজীবী কিশোরগঞ্জের পাবলিক প্রসিকিউটর শাহ কামাল সরকার জানিয়েছেন, আটক পাঁচ আসামির মধ্যে হাইকোর্ট থেকে বড় মিজান ২০২৫ সালের ১৪ মে আর আনোয়ার হোসেন একই বছর ২ জুলাই জামিনে বেরিয়ে গেছেন। এখন বিভিন্ন কারাগারে বন্দী আছেন রাজিব গান্ধী, সোহেল মাহফুজ ও জাহিদুল হক তানিম। মামলার ১০২ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শামসুদ্দিনসহ ৬৬ জন। সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী তারিখ আগামী ৭ সেপ্টেম্বর। ২ নম্বর সন্ত্রাস দমন ট্রাইবুনালের বিচারক অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সুপ্রিয়া রহমান সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন। এ পর্যন্ত মামলার যেসব সাক্ষ্যপ্রমাণ এসেছে, তাতে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে বলে আশা করছেন পাবলিক প্রসিকিউটর শাহ কামাল সরকার।
শোলাকিয়া জঙ্গি হামলার ১০ বছর, ‘মা হত্যার বিচার বাবা দেখে যেতে পারেননি আমি দ্রুত শাস্তি চাই’
59 views
