পুলিশের আলোচিত-সমালোচিত সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ ২৯ বছর আগে ঠিক এ চ্যালেঞ্জই ছুড়েছিলেন আমাকে! ঘটনাটি ১৯৯৮ সালের ৬ নভেম্বর, শুক্রবারের। তিনি কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার। কর্মক্ষেত্রে সেসময়ই ‘অঘটন ঘটন পটীয়সী’ হিসাবে ‘নামডাক’ করেছেন। আর আমি তখন প্রথম আলোর নাদান রিপোর্টার। ভোরের কাগজে ইস্তফা দিয়ে এসে জয়েন করেছিমাত্র।
প্রথম আলো প্রকাশের তৃতীয় দিন, ৬ নভেম্বর আমার সাংবাদিকতার মহাজন তৌহিদুর রহমান ভাই পত্রিকার শেষের পাতায় ছয় কলামে ছেপে দিলেন আমার ঢাউস এক রিপোর্ট। দূরগ্রামের সত্তরোর্ধ কবিরাজ ভানু সরকারের সাথে ৬৫ বছরের এক মুসলিম নারীর ‘অসম সম্পর্ক’ হয় এবং এর জের ধরে গ্রামবাসীর মবের শিকার হয়ে ওই কবিরাজের মৃত্যু ঘটে। (প্রায় ২৯ বছর আগেও মব জারি ছিল। ভাবা যায়!)
হত্যাকান্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার আতঙ্ক থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু পুলিশের চাঁদাবাজি অতিষ্ঠ করে তুলেছিল সবাইকে। শোনা যাচ্ছিল, তখনই দুই-আড়াই লাখ তোলা হয়ে গেছে। বেটাছেলেরা বউ-বাচ্চা রেখে কয়েক মাস আত্মীয়দের বাড়িতে, এমনকি ঘরের চালায়, খড়ের গাদায়, ফসলের মাঠে ঘুমিয়েছে। সে সুযোগে গ্রাম্য টাউটরা নামে বাণিজ্যে। পুলিশের নামে ওঠে চাঁদা। আবার চাঁদা দাতাদের টোকেনও দেওয়া হয়। আমার রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল এর সব উপাত্ত নিয়েই।
তো সকালে পত্রিকা হাতে পেয়ে মাথায় বাজ পড়ে এসপি বেনজীরের। চাঁদি গরম হয়ে ওঠে। জুমার নামাজের ড্রেস পরেই তিনি সদলবলে চলে যান ঘটনাস্থল তাতালচরে। এসে আমার সন্ধান করেন। দু’একজন গ্রামবাসীর কাছ থেকে সব শুনেটুনে চলে যাওয়ার আগে বলে যান, পরদিনই তাঁর উপস্থিতিতে ‘শুনানি’ হবে। আমাকে যেন হাজির রাখা হয়। তবে লোকজন তাকে জানায়, ‘ও-বেটা ঘাড়ত্যাড়া’।
পরদিন শনিবার, ৭ নভেম্বর কিশোরগঞ্জ থেকে ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে গ্রামের মসজিদ চত্বরে ‘যমদূত’ এসে হাজির। (আড়াই যুগ আগে এসপির প্রকাশ্য ক্যামেরা ট্রায়াল। ভাবুন একবার!) আমিও সাজ্জাদ পারভেজসহ আমার বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীসমেত ‘ট্রায়ালে’ যথারীতি উপস্থিত। তিনি একে একে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা-বিবরণ শ্রবণ করলেন। সাক্ষ্য নিলেন যাদের তারা প্রায় সকলেই প্রৌঢ় ও বৃদ্ধ। কেন-না যুবকেরা সব উধাও।
পুলিশের নামে চাঁদা আদায়কারী টাউটগুলো পত্রিকার প্রতিবেদনকে ভুয়া প্রমাণে মিথ্যা গল্প ফাঁদলেন। চাঁদা তো দূরের কথা, চাঁদার স্লিপ-ট্লিপ এর সবই নাকি বানোয়াট! ওদিকে পুরো সত্যিটা জেনেও পুলিশবেষ্টিত এসপি বেনজীরের স্মার্টনেস আর শার্পনেসের সামনে গ্রামের সরলপ্রাণ মানুষজন নির্বাক। ভীতও। আমাদের মনে হলো, আসল সত্যটা ধামাচাপা পড়তে চলেছে বুঝি।
ওদিকে ক্যামেরা চলছে। ত্রাহিত্রাহি অবস্থা। আচমকা গ্রামের প্রবীণ, প্রাজ্ঞ ব্যক্তি তাজুল ইসলাম লাঠি ভর করে উঠে দাঁড়ালেন। বলে বসলেন, ‘স্যার, সাম্বাদিক সাইবে যা লিকছে সব হাছা কথা। চান্দাবাজি হৈছে। আমরা সবই জানি’।
তাঁর সাক্ষ্য প্রদানের পরপরই পরিবেশ কিছুটা যেন ঝিমিয়ে পড়ে। তাপ-প্রতাপ কমে আসে পরিবেশ ও কর্তার। জোত করতে না পেরে এসপি বেনজীর আচমকা ক্ষেপে যান। এক-দুই কথায় পুলিশের বিরুদ্ধে নিউজ করার নতিজা সম্পর্কে বয়ান করেন। ঘটনার সাক্ষীরা তো সাক্ষাৎ আমার সামনেই! আমিও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তাকে বলি, ‘রিপোর্ট আরো হবে’।
এক পর্যায়ে এসপি তর্জনী উঁচিয়ে হুঙ্কার দিয়ে বলে ওঠেন, ‘আই টুক দিজ চ্যালেঞ্জ জেন্টলম্যান’! এরপর অনিবার্য পরিণতি ও প্রতিক্রিয়ায় গ্রামবাসীর ওপর থেকে অপ্রকাশ্য হুলিয়া আপনাআপনি প্রত্যাহার হয়ে যায়। বন্ধ হয় চাঁদা আদায়। কয়েকজন চাঁদার কিছু টাকা ফিরেও পায়! ওদিকে গা ঢাকা দিয়ে চলা বেটাছেলেরা ফিরে আসে প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে।
এদিকে আমি পড়লাম রোষে। পড়িলাম দণ্ডমুণ্ডের ওই কর্তার প্রতিশোধপরায়ণতার ক্রোধে। তিনি আমার বিরুদ্ধে পুলিশ লেলিয়ে দেন। দুই গ্রাম্য টাউট ও পুলিশ ফ্রেন্ডকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে দু-দুটো মামলা দায়ের করিয়ে তবে কিশোরগঞ্জ ছাড়েন।
‘আমার কথাটি ফুরোল, নটে গাছটি মুড়োল’..
-নাসরুল আনোয়ার
বসন্তপুর
১৫ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

