# নিজস্ব প্রতিবেদক :-
সদ্য প্রয়াত কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবের বিশিষ্ট সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী ভৈরবের কৃতিসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক আলহাজ্ব মো. রফিকুল ইসলাম। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রতিভার অধিকারী মো. রফিকুল ইসলাম ১৯৪৮ সালে ভৈরবের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক জীবন শুরু করলেও রফিকুল ইসলাম রাজনীতির চেয়ে শিক্ষা বিস্তার ও সমাজকল্যাণে অধিকতর মনোনিবেশ করেন। তিনি ১৯৮২ সালে ভৈরবপুর এলাকার অসংখ্য বঞ্চিত শিশু-কিশোরদের প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যে তাঁর পিতামহীর নামে স্থাপন করেন ফাতেমা রমজান প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৮৩ সালে তিনি ভৈরবে প্রথম কিন্ডার গার্টেন পদ্ধতির প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করেন। (মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আরবের রহমান (সুরুজ মিয়া)) স্থাপন করেন শহীদ আরবের রহমান কিন্ডার গার্টেন। সৃজনশীলতা, শিক্ষানুরাগ ও সৎকর্ম প্রচেষ্টার মূর্ত প্রতীক হিসেবে নন্দিত মো. রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত উল্লেখযোগ্য অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ হচ্ছে- মুর্শিদ মুজিব হাইস্কুল (১৯৮৬), কালীপুর উত্তর রেজি. প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯৯৪), নিজাম উদ্দিন প্রাথমিক বিদালয় (২০০২)। এছাড়া তিনি তাঁর মরহুম মাতার ওছিয়ত করা জায়গায় ভৈরবের প্রথম মহিলা মাদ্রাসা হালিমা সাদিয়া মহিলা মাদ্রাসা স্থাপন করে মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ভৈরবের প্রথম নারী শিক্ষার উচ্চ বিদ্যাপীঠ রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজ শিক্ষার গুণগত মান, চমৎকার ব্যবস্থাপনা এবং মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে দেশের অন্যতম আদর্শ বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য, কলেজটি ২০০২ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত হয়েছে। শিক্ষা বিস্তারে নিবেদিতপ্রাণ মো. রফিকুল ইসলাম উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়াও অনেক শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্নির্মাণ ও পরিচালনায় অবদান রেখেছেন। ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে ’৮০-এর দশকের প্রথমভাগে প্রায় ধ্বংসোন্মুখ আনসার ক্যাডেট প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে তিনি নতুন প্রাণের সঞ্চার করেন। তিনি দীর্ঘ ১৫ বছর উক্ত বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। জনাব আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় জমির অভাবে সরকার কর্তৃক নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ ১৬ লক্ষ টাকা ফেরত চলে যাবার উপক্রম হলে তিনি উদ্যোগ নিয়ে প্রয়োজনীয় জমি ক্রয়ের ব্যবস্থা করে ভবনের নির্মাণ নিশ্চিত করেন। তিনি কমলপুর জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম এবং শাহী মসজিদ কার্যকরী মাদ্রাসা কমিটির সদস্য, হাজী আসমত কলেজ এবং ভৈরবপুর আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য, জেহাদী মসজিদ পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারী এবং নুরানী মসজিদের মোতওয়াল্লী ছিলেন। তিনি ভৈরব উপজেলা স্কাউটের স্কাউট কমিশনার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মো. রফিকুল ইসলাম প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ভারতের টাঙ্গুয়াতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং ৯ম ফোর্সের কোম্পানি লিডার হিসেবে ২২৮ জন সদস্য বিশিষ্ট দল নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। দেশে প্রবেশের পথে মজলিশপুরে তাঁর দল ওৎপেতে থাকা পাকসেনাদের অ্যামবুশে পড়েন, এ সময় তাঁর দলের সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আশুরঞ্জন
শাহাদাৎ বরণ করেন। কুলিয়ারচর থানার মুজিব বাহিনীর কমান্ডার রফিকুল ইসলাম বক্তার মারার ব্রীজ ধ্বংস এবং অষ্টগ্রামের সন্নিকটে মেঘনা নদীতে পাকসেনাদের জন্য খাদ্যবাহী জাহাজ ডুবানোর অপারেশনে নেতৃত্ব দেন। তিনি ভৈরব কুলিয়ারচর ও বাজিতপুর থানা মুজিব বাহিনীর সমন্বিত অপারেশনের ক্ষেত্রে যৌথ কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সমাজকর্মী মো. রফিকুল ইসলাম রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নেও ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। তিনি চন্ডিবের ও রেল কলোনীর সংযোগ সড়ক, রামশংকরপুর থেকে মহেশপুর পর্যন্ত সড়ক, কালীপুর থেকে বাদশা বিলেরপাড় হয়ে নয়াহাটি পর্যন্ত সড়কসহ প্রায় ১৭টি সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে অবদান রাখেন। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত রফিকুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে জহুরুল হক হলের নির্বাচিত নাট্য সম্পাদক এবং ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি সবুজ বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ হয়ে হল প্রাঙ্গণে ধান চাষ করে ব্যাপক সাড়া জাগান। এ সময় তিনি বাংলাদেশ সবুজ বিপ্লবের উপর বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। দেশব্যাপী সবুজ বিপ্লবের পক্ষে জোয়ার তৈরিতে অবদান রাখেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ৩ পুত্র ও ১ কন্যা সন্তানের জনক। তাঁর জ্যৈষ্ঠপুত্র মো. রাকিব শরফুদ্দীন ঢাকা জজকোর্ট ও হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট, মধ্যমপুত্র ডা. মো. রাফিজ ইমতিয়াজ এবং কনিষ্ঠপুত্র মো. রাফাত ইমরান। একমাত্র কন্যা নাহার রুমকী নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর সহধর্মিনী মিসেস ফাহমিদা রফিক একজন আদর্শ গৃহিনী। তাঁর অনুপ্রেরণা ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রফিকুল ইসলামের শিক্ষা বিস্তার ও সমাজ কল্যাণমূলক কাজের সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এ কৃর্তীমান পুরুষ আলহাজ্ব মো. রফিকুল ইসলাম ২০২৬ সালের ২৩ মার্চ সোমবার বেলা ১১টায় ঢাকার একটি হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন।
একজন রফিকুল ইসলাম
42 views
