বর্ষায় ৫০ কোটি টাকার নৌ অর্থনীতি, পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে হাওরে প্রাণ পাচ্ছে নৌ অর্থনীতি

65 views

# মোস্তফা কামাল :-
এখন কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরে বর্ষার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাওরের সাবমার্জেবল সড়কগুলো তলিয়ে গেছে। সপ্তাহখানেক আগে বন্ধ হয়ে গেছে হাওরের ছয়টি ফেরি। বন্ধ হয়ে গেছে সড়ক পথে যোগাযোগ। ফলে প্রাণ ফিরছে নৌ অর্থনীতিতে। বর্ষাকালকে কেন্দ্র করে হাওরে প্রায় পাঁচ মাস থাকে নৌ ভ্রমণের রমরমা ব্যবসা। তখন হাওরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় এক ধরনের নৌ অর্থনীতি। এই সময়ের মধ্যে হাওরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০ কোটি টাকার নৌ অর্থনীতির কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয় বলে নৌকার মাঝি ও যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।
যাত্রী পরিবহন আর পর্যটক পরিবহনকে কেন্দ্র করে যেমন আবর্তিত হয় এই নৌ অর্থনীতি, আবার নৌ পথে সারা বছরই চলে মালামাল পরিবহন। প্রধানত বর্ষার পানিকে কেন্দ্র করে পাঁচ মাস থাকে যাত্রীবাহী নৌকার রমরমা ব্যবসা। এই পাঁচ মাসে কেবল যাত্রী আর পর্যটক পরিবহন খাতেই অন্তত ৫০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। ৬ জুলাই সোমবার করিমগঞ্জের হাওর পাড়ের বালিখলা খেয়া ঘাটে গিয়ে নৌকার মাঝি আর স্পীড বোটের মালিক পক্ষের সাথে কথা বলে এমন ধারণাই পাওয়া গেছে।
হাওরের মালামাল পরিবহনের প্রধান বাহন নৌকা। সারা বছরই নৌপথে প্রচুর মালবাহী নৌযান চলাচল করে। ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকা থেকে শুরু করে বিশাল বিশাল মালবাহী বাল্কহেড আর কার্গো ছুটে চলে হাওরের বুক চিরে। কিশোরগঞ্জের হাওরের নৌপথ একটি আন্তঃজেলা নৌপথ। ফলে প্রতিদিন শত শত নৌযান চলাচল করে এই নৌপথ ধরে।
এক সময় শুষ্ক ও বর্ষাকাল মিলিয়ে সারা বছরই যাত্রী আর মালামাল পরিবহনেরও একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। প্রায় ৩০ বছর ধরে হাওরের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য সাবমার্জেবল আরসিসি সড়ক। এসব সড়ক বর্ষায় থাকে নিমজ্জিত, আর শুষ্ক মৌসুমে পানি নেমে যাবার পর হয়ে ওঠে হাওরের সড়ক যোগাযোগের অন্যতম উপষঙ্গ। আবার ছয় বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ক। করিমগঞ্জের চামড়া নৌবন্দর, বালিখলা ঘাট এবং বাজিতপুরের পাটলি ঘাট হয়ে হাওরে যাতায়াতের জন্য বিভিন্ন নদীতে সংযোজন করা হয়েছে ছয়টি ফেরি। ফলে শুষ্ক মৌসুমের সাত মাস মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে মাল বোঝাই ট্রাক পর্যন্ত ফেরি পার হয়ে সাবমার্জেবল সড়ক ধরে চলে যায় হাওরের বিভিন্ন উপজেলায়। ২০০০ সালের ৭ অক্টোবর উদ্বোধন করা হয়েছে ‘হাওরের বিস্ময়’ নামে পরিচিত দৃষ্টিনন্দন ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার রোড। এখন এই সড়ক ব্যবহার করেও তিন উপজেলার মধ্যে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে যাতায়াত করা সম্ভব। অন্যদিকে করিমগঞ্জের খয়রত এলাকা থেকে নিকলী উপজেলা সদর পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছে আরও একটি প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ অলওয়েদার সড়ক। এর নাম দেওয়া হয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতির নামানুসারে আব্দুল হামিদ সড়ক।
বাংলাদেশের ঋতুচক্র অনুসারে বর্ষাকাল দুই মাসের হলেও মে মাসের শেষ প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে প্রায় পাঁচ মাস হাওরে থাকে অথৈ পানি। অর্থাৎ কিশোরগঞ্জের হাওরে বর্ষাকাল মূলত পাঁচ মাসের। তখন কেবল দু’টি অলওয়েদার সড়ক ছাড়া হাওরের সকল সাবমার্জেবল সড়ক ডুবে যায়। ফলে এই পাঁচ মাস সড়ক পথে হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। তখন একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় নৌযান। শুষ্ক মৌসুমে যাত্রীবাহী নৌকার বাজার থাকে খুবই মন্দা। কিন্তু বর্ষার পাঁচ মাস যেন নৌ অর্থনীতি প্রাণ ফিরে পায়। নৌকার মাঝিরা আর স্পীড বোটের মালিকরাও এই সময়ে আয়রোজগারের একটি সুযোগ পান। মাঝিরা বছরের বাকি সময়টা ক্ষেতমজুরি করে, মাছ শিকার করে বা অন্য কোন দিনমজুরি করে সংসার চালান। কিন্তু বর্ষাকালে নৌকাই হয়ে দাঁড়ায় তাদের আয়ের একমাত্র উৎস।
বালিখলা ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, প্রচুর নৌকা সারিবদ্ধভাবে নোঙর করা আছে। যাত্রী আর পর্যটকরা আসছেন, দরদাম করে রিজার্ভ নিয়ে হাওরে পাড়ি জমাচ্ছেন। আবার রয়েছে আটটি স্পীড বোট। বিভিন্ন নৌকায় রয়েছে আবার বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বাক্ষর। কোন নৌকার ছাদে যাত্রীদের ছায়ার জন্য টানানো হয়েছে আর্জেন্টিনর পতাকার আদলে সামিয়ানা। আবার কোন নৌকায় দেখা গেছে ব্রাজিলসহ বিভিন্ন পছন্দের দেশের পতাকা। হাওরে পানির উচ্চতা ক্রমশই বাড়ছে। অন্তত ১৫ দিনের মধ্যেই পানির উচ্চতা বেড়ে পুরো হাওরঞ্চল অনেকটা সমুদ্রের রূপ ধারণ করবে। তখনই বিভিন্ন জেলাসহ দূরদূরান্তের পর্যটকদের সমাগম বাড়তে থাকবে। নৌযান ব্যবসাও তখন আরও জমজমাট হয়ে উঠবে।
করিমগঞ্জের সুতারপাড়া এলাকার মাঝি মো. নিজাম উদ্দিন জানান, ধারদেনা করে নৌকা বানিয়ে তিনি বর্ষাকালের পাঁচ মাস নৌকা চালিয়ে বেশ ভাল করেই সংসার চালিয়ে নিতে পারেন। শুষ্ক মৌসুমে প্রধানত কৃষি কাজে নিয়োজিত হন। নিকলী উপজেলার ডুবি এলাকার মাঝি সাইদু মিয়া জানান, তিনিও বর্ষাকালে পাঁচ মাস নৌকা নিয়ে ব্যবসায় নামেন। মোটামুটি ভাল আয়রোজগার হয়। পরিবার নিয়ে চলতে কোন অসুবিধা হয় না। বাকি সাত মাস জমিতে কাজ করেন, মাছ শিকার করে টিকে থাকার চেষ্টা করেন। কিছু যাত্রী বা পর্যটক মিলে তাদের নৌকা রিজার্ভ ভাড়া নেন। নৌকা চালিয়ে দৈনিক চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। বালিখলা ঘাটে প্রায় আড়াইশ’ নৌকা রয়েছে। নিকলীর বেড়িবাঁধ এলাকা থেকেও প্রায় আড়াইশ’ নৌকা চলাচল করে। এছাড়া করিমগঞ্জের চামড়া নৌবন্দন থেকে প্রায় দুইশ’, আর বাজিতপুরের পাটলি ঘাট থেকে প্রায় দেড়শ’ নৌকা চলাচল করে বলে তারা ধারণা দিয়েছেন। এসব ঘাট থেকে বেশ কিছু স্পীড বোটও চলাচল করে। তবে এর বাইরে কিছু নৌকাকে বলা হয় লাইনের নৌকা। এসব নৌকা হাওরের বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী পরিবহন করে। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে এগুলি চলাচল করে। এসব নৌকায় বালিখলা ঘাট থেকে মিঠামইনে একজন যাত্রী পরিবহনে ভাড়া নেওয়া হয় ৮০ টাকা।
বালিখলা ঘাটে রয়েছে স্পীড বোটের অফিস। অফিসের দায়িত্বে নিয়োজিত মো. আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, তিনি এখান থেকে মিঠামইন পর্যন্ত আটটি স্পীড বোট পরিচালনা করেন। প্রতিটি স্পীড বোটে যাত্রী ধরে ১০ জন। প্রতি যাত্রীর ভাড়া ২৪০ টাকা। তিনি জানান, নৌকায় মিঠামইন যেতে সময় লাগে দেড় ঘন্টা। আর স্পীড বোটে যেতে লাগে মাত্র ২০ মিনিট। ফলে যাদের জরুরি প্রয়োজন থাকে বা রোগী থাকে, তারা স্পীড বোটে যাতায়াত করেন। প্রতিটি স্পীড বোট দৈনিক অন্তত আটটি ট্রিপ দিতে পারে। স্পীডবোটের যাত্রী করিমগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি একটি জরুরি কাজে মিঠামইন যাচ্ছন। আবার তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে। ফলে তিনি ২৪০ টাকা ভাড়া দিয়েই স্পীড বোটে যাচ্ছেন। আবার স্পীড বোটেই ফিরবেন। লাইনের নৌকার যাত্রী মিঠামইন সদরের সবুজ মিয়া জানান, তারা তিনজন জেলা শহরে একটি কাজ সেরে মিঠামইন যাচ্ছেন। সময়ে তাড়া নেই। স্পীড বোটে যেতে একজনের ভাড়া লাগে ২৪০ টাকা। অথচ লাইনের নৌকায় তিনজনের ভাড়া লাগে ২৪০ টাকা। সেই কারণে তারা লাইনের নৌকায় যাচ্ছেন। জেলার চারটি খেয়া ঘাট এলাকায় দৈনিক ভাড়া লেনদেন হয় প্রায় ৩৫ লক্ষ টাকা। আর পাঁচ মাসে লেনদেন হয় প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
নৌ অর্থনীতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরের সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম পৌর মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. জালাল উদ্দিন বলেছেন, হাওরের নৌ অর্থনীতি এক ধরনের মাইক্রো অর্থনীতির পর্যায়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমের নৌ অর্থনীতি স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞে এক ধরনের প্রাণ সঞ্চার করে, গতি সঞ্চার করে। নৌকার মাঝিদের যেমন অর্থের সংস্থান ও আর্থিক লেনদেন বৃদ্ধি পায়, তেমনি স্থানীয় ছোট থেকে বড় ব্যবসায়ীদের পণ্য বিপননেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। নৌ অর্থনীতি আবার ভ্যাট বা ট্যাক্সের মাধ্যমে জাতীয় অর্থীনিতিতেও অবদান রাখে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *