# মিলাদ হোসেন অপু :-
শরীর ছিল চটের বস্তায় মোড়ানো। তাঁর উপরে ঘার থেকে কোল পর্যন্ত ছিল ৪০ কেজি ওজনের শিকলে প্যাঁচানো। শিকলের বিভিন্ন অংশে ছিল ছোট-বড় ১২টি তালা। হাতে আঙ্গুলে ছিল ৮টি আংটি ও কব্জিতে লোহার চুড়ি। শরীরে বিভিন্ন অংশে কাটা দাগ। শিকল বয়ে বয়ে শরীর শক্ত হয়ে গেছে তাঁর। স্ত্রীর মৃত্যু ও পানিতে বিলীন হওয়া বাড়িঘর ও জমি হারিয়ে যেন এক ভবঘুরে পাগলের জীবন বেছে নিয়েছে পাগল রাশেদ বেপারী (৪০)। ভবঘুরে জীবন থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন রাশেদ। আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে সহায়তা করলেন ভৈরব থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইদ আহমেদ।
৩ এপ্রিল শুক্রবার নিজেকে পরিপাটি করে ওসি সাইদ আহমেদের সাথে রেলওয়ে জামে মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করেছেন রাশেদ বেপারী। নামাজ শেষে ওসির সাথে দুপুরের খাবার খেয়ে পরিবারের কাছে নিজ গ্রাম চাদপুর জেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের লালপুর বাজার এলাকায় ফিরবেন রাশেদ বেপারী। তাঁর বাবার নাম সুরুজ মিয়া।
রেলওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাশেদ বেপারী ছিলেন এক আনসার বিডিবির সদস্য। ১৪ বছর আগে বিয়ে করেন সে। ১৩ বছর আগে একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিয়ে তাঁর স্ত্রী বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করে। অপরদিকে নদী ভাঙ্গনে হারিছেন চাদপুরের কালনিতে নিজ জমি ও বসত বাড়ি। বাবা-মা ভাই-বোন ও ১৩ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে সন্তান বাদশাকে ছেড়ে এসে নিজে সেজেছে পাগল ভবঘুরে।
থাকেন ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন এলাকায়। বিষয়টি বেশ কয়েকদিন যাবত রেলওয়ে ওসির নজরে আসলে তিনি ভবঘুরে রাশেদকে নিজ হেফাজতে নিয়ে তাঁর শরীরে বহণকরা চটের বস্তা, ৪০ কেজি ওজনের শিকল, ৮টি আংটি ও হাতে লোহার চুড়ি অপসারণ করেন। এছাড়া তাকে ভাল ভাবে গোসল করিয়ে ভাল কাপড় চোপড় পড়িয়ে দেন এবং তাঁর পছন্দ মতো খাবারও খাওয়ান ওসি। পাগল রাশেদ বেপারী এখন ৮-১০ জন স্বাভাবিক মানুষের মতো চলাফেরা করছেন।
পাগল রাশেদ বেপারী বলেন, আমি স্ত্রী ও বাড়িঘর হারিয়ে পাগল হয়ে ভবঘুরে হয়েছিলাম। ১২ বছর আগে ঘর ছেড়েছিলাম। ওসি স্যার আমাকে সঠিক হওয়ার রাস্তা দেখিয়েছেন। আমি ভুল ছিলাম। আল্লাহকে চাইলে পাগল হওয়া লাগে না। আল্লাহকে সব জায়গায় পাওয়া যায়। আমি এতো দিন ভুল করেছি। আমি আমার একমাত্র ছেলের কাছে ফিরে যাবো। প্রয়োজনে অটো রিকশা চালাবো। না হয় চায়ের দোকান দিয়ে ছেলেকে নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবো। আমি আমার বউকে অনেক ভালবাসতাম তাই বিয়ে করবো না। আমি রেলওয়ে ওসি স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞ।
ওসি সাইদ আহমেদ বলেন, আমি রেলওয়ে পুলিশের চাকরি করতে এসে স্টেশন এলাকায় বেশ কিছু ভবঘুরে মানুষ দেখেছি। এদের মধ্যে কেউ ভিক্ষুক আবার কেউ পাগল বা সন্ন্যানী। কয়েকদিন যাবত আমি কয়েকজন পাগলের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে দেখেছি। তাদের একটু তদারকি করলে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে। ইতিমধ্যে একজন শিশু ও একজন পাগলকে তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছি। শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে রাশেদ বেপারী নামের এক পাগলকে তাঁর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছি। তাঁর শরীরে ৪০ কেজি ওজনের শিকল ছিল। ১২ বছর যাবত ভৈরব স্টেশন এলাকায় ভবঘুরে অবস্থায় ছিল। পাগল হয়ে ঘুরে ফিরেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। তাঁর সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে বুঝতে পেরেছি তাকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে দেয়া যাবে। স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে শিকল মুক্ত করেছি। পরে তাঁর শিশু সন্তানের সাথে কথা বলিয়ে দিয়েছি। তাঁর ১২ বছর বয়সী ছেলে মুন্সিগঞ্জের গৌরীপুর মাদ্রাসায় পড়ে। ইতিমধ্যে দুই পাড়া কোরআন মুখস্থ করেছে। রাশেদ বেপারী এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবে। মানুষিক চাপ থেকে মানুষ সব ছেড়ে ভবঘুরে হয়ে যায়। আমাদের মানবিকতাই পারে একজন মানুষকে তাঁর স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিতে।

