মোস্তফা কামাল :-
ভাগ্যের উন্নয়নের আশায় কিশোরগঞ্জ থেকে লক্ষাধিক মানুষ প্রবাসে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজে নিয়োজিত আছেন। তারা গেছেন সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন জনশক্তি রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে। তবে এর বাইরেও অনেকেই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হয়ে আয় উপার্জন করছেন। এদের কেউ গেছেন স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে, কেউ গেছেন পর্যটক ভিসা নিয়ে। আবার কেউ গেছেন অবৈধ উপায়ে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হয়ে চাকরি করছেন। যে কারণে তাদের নাম জনশক্তি হিসেবে সরকারের বৈদেশিক কর্মসংস্থান কার্যালয়ের তালিকায় নেই।
তবে এখন পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের ২১৪ জন প্রবাসী বিদেশে বিভিন্ন কারণে মারা গেছেন বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কিশোরগঞ্জের প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের পরামর্শক আজিজুর রহমান তাপস। এদের মধ্যে সম্প্রতি রাশিয়ায় যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন কিশোরগঞ্জের দুই যুবক রিয়াদ রশিদ (২৮) ও জাহাঙ্গীর হোসেন (২৫)। এদেরকে প্রতারণা করে রুশ সেনাবাহিনীতে ঢোকানোর দায়ে দু’টি জনশক্তি রপ্তানিকারক কোম্পানির লাইসেন্স ইতোমধ্যে সরকার বাতিল করেছে বলে জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জের জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মাহফুজ-উল-আদিব।
প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের পরামর্শক আজিজুর রহমান তাপস জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের পর প্রবাসে গিয়ে যারা মারা গেছেন বা আগামীতে মারা যাবেন, তাদের পরিবার এককালীন ১৩ লক্ষ টাকা পাবে। পাশাপাশি ১০ লক্ষ টাকার বীমা এবং অনুদান হিসেবে তিন লক্ষ টাকা করে পাবে। লাশের সৎকারের জন্য দেওয়া হয় ৩৫ হাজার টাকা। কেউ আহত হলেও তাদের জন্য বিভিন্ন রকম আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়। কিশোরগঞ্জে এ পর্যন্ত ৪৪৭ জনকে বীমা, চিকিৎসা সহায়তা এবং মরণোত্তর অনুদান বা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২১৪ জনকে মরণোত্তর আর্থিক সুবিধাদি প্রদান করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তির আরও ৪৮টি ফাইল প্রস্তুত করা হচ্ছে। বিদেশ থেকে লাশ দেশে আসার দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে পরিবার অনুদানের চেক পেয়ে যায়। বীমা বাবদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে ১৩০টি ফাইল। এগুলি ৫০ হাজার টাকা করে বীমা পলিসি। আবার নানা কারণে আহতদের চিকিৎসা সহায়তা বাবদ ৬০টি ফাইল পাঠানো হয়েছে। একেকজন দুর্ঘটনার ধরন অনুযায়ী দেড় লক্ষ থেকে দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সহায়তা পাবেন। তবে কোন কোম্পানিতে যদি কারও বেতন বকেয়া থাকে, সেগুলি ওই কোম্পানি কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়।
এদিকে রুশ সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়ে ইতোমধ্যে ইউক্রেনের হামলায় কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার দুই যুবক রিয়াদ রশিদ (২৮) ও জাহাঙ্গীর হোসেন (২৫) নিহত হয়েছেন। জাফরাবাদ ইউনিয়নের মাঝিরকোণা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রশিদের ছেলে রিয়াদ রশিদ একটি প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি নিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাকে রুশ সেনাবাহিনীতে ঢোকানো হয়। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে রিয়াদ গত ২ মে রুশ সীমান্তে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। তাঁর লাশটি পুড়ে ছাঁই হয়ে গেছে। বাড়ি আনারও উপায় নেই বলে জানিয়েছেন বাবা আব্দুর রশিদ। অন্যদিকে জয়কা ইউনিয়নের বাগপাড়া গ্রামের প্রয়াত হাবিবুর রহমানের ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেনকেও একটি হোটেলে চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিলেন। পরবর্তীতে কোম্পানির লোকেরা তাকে প্রথমে শূকরের খামারে, পরে রুশ সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়ে দেয়। তিনিও গত ১৮ মে ইউক্রেনের স্থাপন করা মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন। তাঁর লাশটিও দেশে আনার উপায় নেই বলে পরিবারের আশঙ্কা।
এছাড়া কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার দানাপাটুলি ইউনিয়নের গাগলাইল গ্রামের প্রয়াত সুরত আলীর ছেলে আবু হানিফকে (২৫) রাজমিস্ত্রীর কাজের কথা বলে একটি কোম্পানি রাশিয়ায় পাঠিয়েছিল গত ৭ এপ্রিল। ১৭ এপ্রিল সর্বশেষ পবিারের সাথে কথা বলে জানিয়েছিলেন, তাকে রুশ সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকে আর কোন যোগাযোগ নেই। বাড়িতে বৃদ্ধা মা ও পাঁচ মাসের অস্ত:সত্ত্বা স্ত্রী রয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, আবু হানিফ হয়ত বেঁচে নেই। তারা সারাক্ষণ আজাহারি করছেন।
প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের পরামর্শক আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, রিয়াদ রশিদ ও জাহাঙ্গীর হোসেনের পরিবার প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারে যোগাযোগ করেছে। তাদের অনুদানের ব্যাপারে ফাইল প্রস্তুত করা হচ্ছে। তাদের পরিবারও প্রথমে তিন লক্ষ টাকা করে অনুদান পাবে। তবে তাদের লাশের কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া দানাপাটুলি এলাকার আবু হানিফের বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারকে কেউ অবহিত করেনি। পরিবার যোগাযোগ করলে তাঁর বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আজিজুর রহমান।
কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুড়ি এলাকার বাচ্চু মিয়া শ্রমিক হিসেবে চাকরি করতেন সৌদি আরবের আল খারিজ শহরের একটি কোম্পানিতে। গত ৮ মার্চ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিনি সেখানে নিহত হয়েছেন। শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ১৭ মার্চ নিহতের বাড়ি গিয়েছিলেন। তবে বাচ্চু মিয়ার লাশটি আনার মত অবস্থায় ছিল না। যে কারণে গত ২৭ মার্চ সেখানেই জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে। তাঁর পরিবারকে এককালীন সাড়ে তিন লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের পরামর্শক আজিজুর রহমান। নিহতের একটি প্রতিবন্ধী ছেলে রয়েছে। তাকে সরকার আগামী সাত বছর বার্ষিক ২৪ হাজার টাকা করে দিয়ে যাবে।
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মাহফুজ-উল-আদিব জানিয়েছেন, সারাদেশের এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ প্রবাসে চাকরি করছেন। কিশোরগঞ্জেরও লক্ষাধিক লোক রয়েছেন। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ থেকে বিভিন্ন দেশে চাকরি নিয়ে গেছেন ১১ হাজার ৬৭৪ জন। এদের মধ্যে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেই বেশি সংখ্যক মানুষ গেছেন। তবে এর বাইরে অনেকেই স্টুডেন্ট ভিসায় বা পর্যটক ভিসায় গিয়ে সেসব দেশে বিভিন্ন চাকরিতে নিয়োজিত হয়ে যান। এদের হিসাবটা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে থাকে না। তিনি জানান, যেসব জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রতারণা করে, তাদের বিষয়ে সরকার সবসময়ই কঠোর। করিমগঞ্জের রিয়াদ রশিদকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিল ‘বন্যা-বিজয় ওভারসীজ লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। আর জাহাঙ্গীর হোসেনকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিল ‘হক ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এ দু’টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদিশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। দু’টি কোম্পানির লাইসেন্স ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় বাতিল করে দিয়েছে।
প্রবাসী মারা গেছেন ২১৪, দুই কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার
52 views
