ভৈরবে ইমান খান হত্যার ঘটনার মামলায় পুরুষশূন্য গ্রাম, অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট

220 views

# আফসার হোসেন তূর্জা :-
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে বাবার জন্য মিনিট কার্ড আনতে গিয়ে প্রতিপক্ষের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ইমান খান (১৯) নামে যুবকের হত্যার ঘটনায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। ২৩ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের লুন্দিয়া গ্রামে পাগলা বাড়ির ইছা মিয়ার ছেলেকে হত্যার অভিযোগ উঠে শেখ বাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ২৬ মার্চ ৭৯ জনের নাম উল্লেখসহ ৮/১০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করেন নিহতের বাবা ইছা মিয়া। এদিকে হত্যার ঘটনায় মামলা হওয়ার পর থেকে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে শেখ বাড়ির লোকজন। এতে পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে পুরো গ্রামের শেখ বাড়ির বংশের বিভিন্ন এলাকা। সেই সুযোগে শেখ বাড়ির প্রায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করে বাড়ির জিনিসপত্র নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে পাগলা বাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে।
এদিকে ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর পেয়ে ৩০ মার্চ বিকালে লুন্দিয়া গ্রামের ভাঙচুরের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার কেএম মামুনুর রশীদ। এসময় উপস্থিত ছিলেন, ভৈরব থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দসহ থানা পুলিশ সদস্যরা।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ৭/৮ বছর যাবত আগানগর ইউনিয়নের পাগলা বাড়ির সাথে শেখ বাড়ির দ্বন্দ্ব চলছিল। ইতোমধ্যে ৪/৫ বার ঝগড়াও হয়েছে। পাগলা বাড়ির নেতৃত্ব দেন আব্দুল মজিদ বড় মিয়া ও শহিদ মিয়া এদিকে শেখ বাড়ির নেতৃত্ব দেন মাইন উদ্দিন শেখ ও আক্কাছ শেখ।
২৩ মার্চ রাতে উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের পাগলা বাড়ির ইমান খান নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে শেখ বাড়ির লোকজন। এরই জের ধরে ২৩ মার্চ রাত থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত শেখ বাড়ির বিভিন্ন বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। লুন্দিয়া গ্রামের বড়পাড়া, চরপাড়া ও শেখ বাড়ির গোলাপ মেম্বারের বাড়িঘরসহ কমপক্ষে ৫০টি বসতবাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে পাগলা বাড়ির লোকজন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ, ভৈরব সেনাবাহিনী ও র‌্যাব ক্যাম্পের সদস্যরা।
৩১ মার্চ মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের লুন্দিয়া গিয়ে দেখা যায় শেখ বাড়ির বিভিন্ন বাড়িঘর ভাঙচুর হয়ে পড়ে আছে। বিল্ডিং ঘরগুলো দরজা, জানালাসহ সবকিছু খুলে নিয়ে গেছে। টিনশেড ঘরগুলোর চালা পর্যন্ত উধাও। এমন চিত্র দেখা গেছে লুন্দিয়া গ্রামের বিভিন্ন পাড়ার শেখ বাড়িগুলোতে। বাড়িঘরগুলো সব মানুষ শূন্য। একাধিক বাড়িঘর ঘুরে পুরুষদের পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকজন নারীকে দেখতে পাওয়া যায়।
এদিকে ভাঙচুর ও লুটপাটের খবরে একই ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের লোকজন ভিড় করছেন ভাঙচুর হওয়া বাড়িঘর দেখতে। এসময় কথা হয় আগানগর গ্রামের যুবক রাফসান ও রাহুল মিয়ার সাথে। তারা বলেন, বর্তমানে বিশ্ব উন্নত ও আধুনিক সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর আমরা এখন বর্বর ও আদিযুগে পড়ে আছি। মানুষের সারা জীবনের ইনকাম দিয়ে বাড়িঘর তৈরি করে। একটি হত্যা ঘটনায় মানুষগুলো স্বপ্ন ভেঙেচুরে লুটপাট করে নিয়ে যায় প্রতিপক্ষ। ভৈরবের বিভিন্ন গ্রামে হত্যা ও মারামারির ঘটনা ঘটলেই ভাঙচুর লুটপাট হয়। লুন্দিয়ায় একটি হত্যার ঘটনায় প্রতিপক্ষের হামলায় ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে শুনেছি। এসে দেখি ভয়ংকর অবস্থা। বাড়ি ঘরের ইট পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে। গ্রামটি শ্মশানঘাটে পরিণত হয়েছে। আমরা ভৈরবের মানুষ এমন বর্বরতা চাই না। আমরা লুন্দিয়ার ঘটনায় মর্মাহত।
নিহতের বাবা ইছা মিয়া বলেন, একটা মিনিট কার্ড আনতে পাঠিয়েছিলাম ছেলেকে। আমার ছেলে লাশ হয়ে ফিরেছে। ১ সপ্তাহ হয়েছে আমার ছেলেকে শেখ বাড়ির লোকজন অতর্কিত ভাবে হামলা করে হত্যা করেছে। এখনো কোন আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। আমি দোষীদের ফাঁসি চাই।
এ বিষয়ে ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত শেখ বাড়ির মরজিনা বেগম ও রহিমা খাতুন বলেন, দুই যুবকের ঝগড়ায় পাগলা বাড়ির একটি ছেলে মারা গেছে। সেই অপরাধে রাতের আধারে আমাদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। নগদ টাকা, স্বর্ণালংকারসহ হাঁস-মুরগী ও গরু-ছাগল লুটপাট করে নিয়ে গেছে। আমাদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। আমাদের শেখ বাড়ির পুরুষরা মামলা হওয়ায় ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছে। সেই সুযোগে পাগলা বাড়ির লোকজন লুটপাট ও ভাঙচুর করেছে। আমরা অপরাধীদের বিচার চাই।
এ বিষয়ে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার কেএম মামুনুর রশীদ জানান, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর পাল্টাপাল্টি বাড়ি-ঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে জানতে পারছি। তবে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে পরিস্থিতি অনুকূলে আনতে সহযোগিতা করলে পুলিশের পক্ষে কাজ করা সহজ হবে। তাছাড়া দুই পক্ষ যদি সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে তাহলে পুলিশ সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকলে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে কাজ করতে পারবে না।
ভৈরব থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ জানান, হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ি-ঘর ভাঙচুর লুটপাট চলছে। এতে তৃতীয় পক্ষও লুটপাট ও ভাঙচুর করতে পারে। তাছাড়া নিহত ইমান খানের বাবা ৭৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৮/১০ জনকে আসামি করে থানায় একটি হত্যা মামলা রুজু করেছে। আমরা যাচাই-বাছাই করছি। যেন কোন নিরপরাধ লোক ফেসে না যায় সেদিকে আমরা নজর রাখছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *