বাজারের নামকরণ নিয়ে দুই গ্রামের সংঘর্ষে বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ আহত অর্ধশতাধিক, নিহত ১

22 views

# মিলাদ হোসেন অপু :-
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার একটি বাজারের নামকরণকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব আবারও সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। ২৭ জুলাই সোমবার সকাল ৭টা থেকে ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়ক ও রেলপথ দখল করে এই সংঘর্ষ শুরু হয়। জেলা পুলিশ, ভৈরব র‌্যাব ক্যাম্পের সদস্যরাসহ ভৈরব ও কুলিয়ারচর থানা পুলিশ সদস্যরা সাড়ে ৫ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনে।
সকাল থেকে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার কে.এম মামুনুর রশীদ, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ.এইচ.এম আজিমুল হক, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আবু মুছা শেখ ও ভৈরব থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) লিমন বোস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে তারা ব্যর্থ হলে দুপুর ১টায় কিশোরগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) নাজমুস সাকিব অতিরিক্ত ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
সংঘর্ষে সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত আঞ্চলিক সড়কে ১ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে ও ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে ৭ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থেকে দুপুর ৩টা ২০ মিনিটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এদিকে সকাল থেকে শুরু হওয়া টানা সাড়ে ৫ ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে টেঁটা বিদ্ধ হয়ে মিরারচর গ্রামের মাসুদ মিয়া (৩৭) নামের একজন নিহত হয়েছে। নিহত মাসুদ মিয়া মিরারচর গ্রামের ব্যাপারি বাড়ির আসাদ মিয়ার ছেলে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ভৈরব সার্কেল সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আবু মুছা শেখ।
এর আগে ২৬ জুলাই স্থানীয় এমপি বাংলাদেশ সরকারে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম দুই গ্রামের নেতৃবৃন্দদের সাথে নিয়ে নামকরণের বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। এসময় তিনি দুই গ্রামের ১০ জনকে নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটি করে তিনদিনের মধ্যে সমস্যা সমাধানে আশ্বাস দেন।
প্রতিমন্ত্রীর দেয়া আশ্বাসের ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই ২৭ জুলাই সকাল সাড়ে ৭টায় ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়ক ও রেলপথের দুই পাশে দুই গ্রাম হওয়ায় মহাসড়ক অবরোধ করে দুই গ্রামের মানুষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। পুলিশের হস্তক্ষেপে ১ ঘণ্টাপর সড়ক থেকে সংঘর্ষ সরিয়ে নিলেও পরে আবারও গ্রামের ভিতর রেলপথ দখল করে সংঘর্ষে জড়ায় দুইপক্ষ।
সাড়ে ৫ ঘণ্টা যাবত চলা সংঘর্ষে দুই গ্রামের ১০টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটসহ অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। সংঘর্ষ থামলে ভৈরব বাজার ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ২৮ জন ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদের মধ্যে মোবারক (৪০), হিমেল মিয়া (৩৫), আমির হোসেন (৩০), কাজল মিয়া (৩২), রবিউল হাসান (৩৭), শাহ আলম (৩১), আজিজুর রহমান (২৮), হিরণ মিয়া (৩২), হৃদয় (২১) কে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কিশোরগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। এছাড়াও বাকিরা বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ৪৫ বছর যাবত কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের মানুষদের মধ্যে বাসস্ট্যান্ড এলাকার নামকরণ বিরোধ চলছিল। আকবর নগর গ্রামের মানুষ বাসস্ট্যান্ড এলাকাটিকে আকবর নগর বাসস্ট্যান্ড ও বাজার বলে দাবি করে। অপরদিকে মিরারচর গ্রামের মানুষ বাসস্ট্যান্ডের বাজারটি মিরারচরের বাসস্ট্যান্ড বলে দাবি করে। এই নিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে অনেকবার। গত ১৫ বছরে ৩ বার একই ভাবে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় দুই গ্রামবাসীর। সংঘর্ষের পর ভৈরব থানায় দুই গ্রামবাসীকে নিয়ে সালিশ দরবার হলেও সমাধান হয়নি। সালিশ দরবারে সিদ্ধান্ত হয় এ বাসস্ট্যান্ডকে মিরারচর ও আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড বলা হবে। এছাড়া গত ১০ বছর আগে আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড বাজার কমিটি সিদ্ধান্ত নেই তাদের ব্যবহৃত যে কোন ক্যাশমেমো ও সাইনবোর্ডে আকবর নগর মিরারচর একসাথে লিখে ব্যবহার করতে হবে। পরবর্তীতে কেউ তা মানলেও কেউ কেউ মানছে না। গত ৩ বছর আগে জুলাই মাসে সড়ক ও পরিবহন বিভাগ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একটি পরিচিতি সাইনবোর্ড স্থাপন করে। সাইনবোর্ডে লিখা ছিল শুধু আকবরনগর বাজার। এই লেখা দেখেই ফুঁসে ওঠে মিরারচর এলাকাবাসী। পরে মিরারচর এলাকার কিছু লোক আকবরনগর লেখা সাইনবোর্ডটি উপড়ে ফেলে দিতে গেলে আকবরনগর গ্রামের মানুষ তা বাধা দিতেই সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। ৪৫ বছরে সমাধান দিতে পারেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
আকবরনগর গ্রামের বাসিন্দা রবিন সওদাগর ও জাহানারা আক্তার বলেন, আমাদের বাজারের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমে আকবরনগর গ্রামের অংশ। এমনকি বাজারটি আকবরনগর মৌজায় রয়েছে। বাজারে মিরারচরের মানুষের কোন অংশ নাই। আমাদের বাজার মিরারচরের নামে হতে আমরা দিবো না।
এ বিষয়ে মিরারচর গ্রামের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম ও আমিন মিয়া বলেন, জন্ম লগ্ন থেকেই আমরা আমাদের বাজারকে মিরারচর বাজার হিসেবে জানি। এমনকি মানুষ বাসস্ট্যান্ডকে মিরারচর বাসস্ট্যান্ড হিসেবে চিনে। আমরা বেঁচে থাকলে মিরারচর বাজারকে এককভাবে আকবরনগর বাজার হিসেবে মেনে নিবো না। ভৈরবের নেতৃবৃন্দ বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ৪৫ বছরেও এর কোন সমাধান দিতে পারেনি।
কালিকাপ্রসাদ ইউপি চেয়ারম্যান মো. লিটন মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন যাবত আকবর নগর ও মিরারচর বাসস্ট্যান্ড বাজারকে নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ভৈরবে ২৬ জুলাই এসে নামকরণের সমাধানের জন্য মিটিং করেছিলেন। দুই গ্রামের মানুষদের তিনদিনের ভিতর সমাধানের আশ্বাসও দিয়েছিলেন। ২৭ জুলাই হঠাৎ সকাল থেকে দুই গ্রামের মানুষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। আজকের এই সংঘর্ষের বিষয়ে কোন গ্রামের মানুষই আমাদেরকে অবগত করেনি। দুই গ্রামের মানুষ সমাধানের সুযোগ না দিয়েই তারা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) নাজমুস সাকিব বলেন, বাজারে নামকরণকে কেন্দ্র করে আকবর নগর ও মিরারচর গ্রামের লোকদের সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। জেলা পুলিশসহ ভৈরব-কুলিয়ারচর থানা পুলিশ ও ভৈরব র‌্যাব ক্যাম্পের সদস্যরা সহায়তা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। দুই গ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সোচ্চার রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি এএইচএম আজিমুল হক বলেন, প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সংঘর্ষে ১ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। কিছু বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস খবর দিলে তারা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *