# মোক্তার হোসেন গোলাপ :-
কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে যুবক সাইদুর রহমান হত্যাকাণ্ডের দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত নিয়ে কুয়াশা কাটেনি। একদিকে নিহতের পরিবার দ্রুত বিচার ও দোষীদের ফাঁসি চাইছে, অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান আসামির স্বজনরা বলছেন ভুল মানুষ কারাগারে। সেজন্য মামলাটি সিআইডির মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে এলাকায়।
গত ২৭ মে রাত ২টা ৩০ মিনিটে উপজেলার গোপদিঘী ইউনিয়নের ধলাই গ্রামের সাইদুর রহমান (২৮) দুই ভাই আনিসুর ও আতাবুর রহমানকে নিয়ে মুশুরিয়া গ্রামের ডেওয়ারখালির হাওরে মাছ ধরতে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে আগে থেকে ওৎপেতে থাকা দুর্বৃত্তরা দুই ভাইকে মারধর করে। এক পর্যায়ে বড় ভাই সাইদুরের হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে বল্লম দিয়ে আঘাত করা হয়। তিনি পানিতে তলিয়ে যান।
পরে স্থানীয়রা খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পরদিন ২৮ মে নিহতের মা মোছা. সামছুন্নেহার বাদী হয়ে মিঠামইন থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ২১। ঘটনার পরপরই পুলিশ মামলার প্রধান আসামি নওয়াব মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। তিনি এখন কারাগারে।
এখন দুই পক্ষের দুই রকম বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। আসামি পক্ষের দাবি, নওয়াব মিয়া এই হত্যার সঙ্গে জড়িত নন। বরং পূর্ব শত্রুতার জেরে একটি মহল তাকে ফাঁসিয়েছে।
আসামির স্বজন রহিম উদ্দিন বলেন, নিহত সাইদুর ও তাঁর ভাইয়েরা নওয়াব মিয়ার জায়গাতে নিষেধ সত্ত্বেও মাছ শিকার করতো। এ নিয়ে ঘটনার কয়েকদিন আগে স্থানীয় বাজারে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। এরপরই এই ঘটনা।
আরেক স্বজন হান্নান মিয়ার অভিযোগ, বাদীর এজাহারে অসংখ্য ত্রুটি আছে। এলাকায় নওয়াব মিয়ার একটি প্রতিপক্ষ রয়েছে। বাজারের কথা কাটাকাটিকে পুঁজি করে ওই প্রতিপক্ষই সাইদুরকে হত্যা করেছে বলেন তিনি।
মামলায় ১৪ বছরের কিশোর সিয়ামকেও আসামি করা হয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন। থানা পুলিশের তদন্তে সন্তুষ্ট না হয়ে গত ৮ জুলাই হান্নান মিয়া কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে মামলাটি সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানান।
সরেজমিনে ধলাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহত সাইদুরের পরিবার এখন একেবারে নিঃস্ব। দুই ভাইকে নিয়ে মাছ ধরে সংসার চালাতেন তিনি।
স্ত্রী উর্মি আক্তার এক বছরের শিশু আবির হাসানকে কোলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার স্বামী প্রতিদিন মাছ ধরে বাড়ি ফিরত। সেদিন আর ফিরল না। আমি খুনিদের ফাঁসি চাই। আমার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হলেও যেন দ্রুত বিচার হয়।
নিহতের মা সামছুন্নেহার ও শাশুড়ি আঙ্গুরা বেগমও দ্রুত তদন্ত শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অর্থাভাবে মামলা পরিচালনা করতেও হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
এলাকাবাসীর মতে, হাওরের মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে ধলাই ও মুশুরিয়া গ্রামের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। সাইদুর নিয়মিত অন্যের জায়গায় মাছ ধরতেন। এই নিয়েই বাগবিতণ্ডা হতো। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে।
ঘটনাটি রাতে ঘটায় ঘটনার প্রকৃত সাক্ষ্য নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে গ্রামে। এ কারণে অনেকেই উচ্চ পর্যায়ের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছেন।
মিঠামইন থানা পুলিশ জানায়, মামলার তদন্ত চলমান। প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। সিআইডিতে মামলা হস্তান্তরের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।
একদিকে বিধবা স্ত্রী ও শিশু সন্তানের ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে কারাবন্দি এক ব্যক্তির স্বজনদের ন্যায়বিচারের দাবি। দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানে আটকে আছে মিঠামইনের এই হত্যা মামলা। এলাকাবাসী চায়, দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হোক। নইলে হাওরপারের এই বিরোধ আরও রক্তাক্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
মিঠামইনে সাইদুর হত্যা, সিআইডির তদন্ত চায় আসামি পক্ষ
135 views
