ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আত্মীয়করণের অভিযোগ, ইটনার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা বদলে গেছে

424 views

# নিজস্ব প্রতিবেদক :-
এবারের অবিরাম বৃষ্টি আর আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকার তিন মাস অর্থ ও খাদ্য সহায়তা দেবে বলে আগেই ঘোষণা দিয়েছিল। সেই মোতাবেক স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সহায়তায় কৃষি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমাও দিয়েছিল। কিন্তু সেই তালিকা এখন বদলে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিএনপির নেতা-কর্মীরা সেই তালিকায় ভাগ বসিয়ে নিজেদের আত্মীয়স্বজন ও পছন্দের লোকদের নাম ঢুকিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বহু প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
প্রথমে ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত ৯০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেই তালিকা পাল্টে গিয়ে ক্ষমতাসীনদের স্বজনদের নাম ঢোকানো হয়েছে। বহু প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক বাদলা ইউনিয়নের থানেশ্বর গ্রামের বাসিন্দা তানজির সিদ্দিকী রিয়াদের বাবা মুর্শেদ ভূঁইয়া, তাঁর চাচি সেলিনা আক্তার, ফুপু হোসনে আরা, ফুপাত ভাই সব্বির আহমেদ শাকিলের নাম তালিকায় ঢুকেছে। ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের রফিক, আসাদুল, বাছির, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মস্তুফা, জুয়েল, ইছহাক, এমদাদুল, দুই সহোদর মামুন ও দিনাজসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের বহু নাম রোববার তালিকায় নতুন করে ঢোকানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
যুবদল নেতা রিয়াদের বাবা মুর্শেদ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, এলাকার ইজারা নেওয়া বিলে তাঁর ২১ একর জমি ছিল। যদিও জমিগুলো অন্য কৃষকরা করেছিলেন। তিনি অর্ধেক ধান পেতেন। সবটুকু জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এক একর ৬০ শতাংশ জমি নিজে আবাদ করেছিলেন। সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার বলেনি, কার কতটুকু জমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ পাবেন। ফলে তিনিও ক্ষপিূরণ পাবার যোগ্য। তিনি বলেন, বাদলা এলাকায় বিএনপি তিনটি গ্রুপে বিভক্ত। সবাই সবার বিরুদ্ধে লেগে আছে। তবে তালিকায় নাম দেওয়া হলেও তিনি ক্ষতিপূরণের টাকা নেবেন না বলে জানালেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর ভাই আর বোনের সংসার আলাদা। তাদেরও জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই কারণে তারাও ক্ষতিপূরণের দাবিদার। অনেক জায়গায় সহোদররা ক্ষতিপূরণ পেলেও তারা আলাদা সংসার করেন, আলাদা চাষাবাদ করেন। এক ইউনিয়ন যুবদল নেতাও তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকদের নাম নতুন তালিকায় ঢুকিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফসল হানির সময় এ প্রতিবেদক বাদলা ইউনিয়নের থানেশ্বর গ্রাম পরিদর্শনে গেলে দেখা হয় দরিদ্র কৃষক দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়ার সাথে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানিয়েছিলেন, ৪৫ হাজার টাকা খরচ করে দুই একর জমি আবাদ করেছিলেন। নিমজ্জিত ধান কেটে বাড়ি আনতে আরও ২১ হাজার টাকা খরচ করেছিলেন। কিন্তু সব ধানই পচে নষ্ট হয়ে তিনি সর্বশান্ত। তখন প্রতিবেদনেও তাঁর নাম ছাপা হয়েছিল। তখনই তাঁর নাম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু নতুন তালিকায় তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন তাঁর চলার মত কোন উপায় নেই। পার্শ্ববর্তী কুরশি গ্রামের কৃষক হযরত আলীর ছয় বিঘার মধ্যে চার বিঘা, শাহীন মিয়ার এক একর ৩০ শতাংশের মধ্যে এক একরই নষ্ট হয়ে গেছে। তাদের নামও তালিকায় নেই। বহু ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে স্বচ্ছল কৃষকদের নাম ঢোকানো হয়েছে। ময়মনসিংহে কোটি কোটি টাকার পুঁজি খাটিয়ে ব্যবসা করেন। কিশোরগঞ্জ শহরে থেকে ব্যবসা করেন। এমন জমির মালিকদেরও তালিকায় নাম দেওয়া হয়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। এমনকি কোন জমি নেই, চাষাবাদ করেননি, এমন অনেক ভূমিহীনের নামও তালিকায় ঢোকানো হয়েছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন। তারা প্রশাসনের প্রতি নতুন তালিকা যাচাইবাছাই করার দাবি জানিয়েছেন।
বাদলা ইউপি চেয়ারম্যান আদিলুজ্জামান ভূঁইয়া ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হক জানিয়েছেন, যে ৯০০ কৃষকের তালিকা তাঁরা উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছিলেন, সেই তালিকা বদলে ফেলা হয়েছে। অথচ নতুন তালিকা করার সময় তাদের সাথে কোন কথাও বলা হয়নি। চেয়ারম্যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন।
ইটনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি এসএম কামাল হোসেনকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে বলেন, ইটনা উপজেলায় সহায়তা এসেছে সাড়ে পাঁচ হাজার কৃষকের। কিন্তু তালিকা করা হয়েছিল সাড়ে ১১ হাজারের। ফলে নাম কমাতে গিয়ে কিছু আত্মীয়করণ হয়েছে, অস্বীকার করার উপায় নেই। কোন কোন চেয়ারম্যান, মেম্বার বা নেতারা হয়ত তাদের স্বচ্ছল আত্মীয়দের নাম দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত গরিব কৃষকের নাম হয়ত বাদ দিয়েছেন। এমন হয়েছে। তবে সেটা শতকরা ১০ ভাগের বেশি হবে না বলে তিনি জানিয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধরকে তালিকায় অনিয়ম সম্পর্কে প্রশ্ন করলে বলেন, কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করলে তখন সেটা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বাদলা ইউনিয়নের তালিকা নিয়ে চেয়ারম্যান আদিলুজ্জামান ভূঁইয়ার সাথে কথা বলবেন বলেও তিনি জানালেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *