মোস্তফা কামাল :-
‘গার্মেন্টসে কাজ কইরা দুই পোলারে পড়াইছি। কোন সঞ্চয় করলাম না। ১০ লাখ টেহা ঋণ কইরা বড় পোলারে রাশিয়া পাডাইছিলাম। ভাবছিলাম রোজগার কইরা ঋণও শোধ দিব, সংসারেরও উন্নতি করবো। আর কোন অভাব থাকবো না, দুঃখকষ্ট থাকবো না। এহন সব শেষ অইয়া গেল। অহন আমার কী অইব। ছোট মেয়েডারে কেডা দেখবো।’ বুক চাপড়ে আহজারি করতে করতে এসব কথাই বলছিলেন রাশিয়ায় যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের বাগপাড়া গ্রামের প্রয়াত হাবিবুর রহমানের ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেনের (২৫) মা জাকিয়া বেগম।
জাহাঙ্গীর গত ১৮ মে ইউক্রেনের স্থাপন করা মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। রাশিয়া থেকে টাঙ্গাইলের মৃদুল নামে জহাঙ্গীরের এক বন্ধু ভিডিও কলে মৃত্যুর খবর পরিবারের কাছে জানান শুক্রবার সকাল ১০টায়। এর পর থেকেই পরিবারে চলছে আহাজারি। পাড়াপ্রতিবেশি, আত্মীয়স্বজন কেউ কান্না থামাতে পারছেন না। ২৩ মে শনিবার জাহাঙ্গীরের বাড়িতে গিয়ে এমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিই দেখা গেছে।
জাহাঙ্গীরের পরিবার খুবই সাধারণ মানের একটি টিনের ঘরে বসবাস করে। ছেলের ছবি বুকে নিয়ে মা জাকিয়া বেগম আহাজারি করতে করতে পরিবারে নানা সমস্যার কথা বলছিলেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠার কথা তুলে ধরছিলেন। তিনি বলেন, দুই ছেলে এক মেয়ের মধ্যে জাহাঙ্গীর সবার বড়। দ্বিতীয় ছেলে জাভেদ হোসেন (২২) ঢাকায় একেএম রহমত উল্লাহ কলেজে অনার্স শেষ বর্ষে পড়ছেন। পাশাপাশি ঢাকায় একটা অফিসে অল্প বেতনে পিয়নের কাজ করছেন। মেয়ে জান্নাতুল হাবিবা (১২) এলাকার কান্দাইল উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। জাকিয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় পোশাক কারখানায় তিনি কাজ করতেন। বেতনের টাকা দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা করাতেন। সন্তানদের কথা চিন্তা করে কোন সঞ্চয় করেননি। তাদের বাবা শ্রমজীবী হাবিবুর রহমান চার বছর আগে সংসারের চিন্তায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এই অবস্থায় তিনি দুই বছর আগে মারা গেছেন।
বড় ছেলে জাহাঙ্গীর অনার্স পাস করেছেন। তিনি তিন বছর আগে ফুপাত বোন, একই ইউনিয়নের মধ্য নানশ্রী গ্রামের রফিকুল ইসলামের মেয়ে মাশুকা হোসেনকে বিয়ে করেন। তাদের আমান হোসেন নামে দুই বছরের একটি ছেলে রয়েছে। জাহাঙ্গীর বিভিন্ন জায়গা থেকে ১০ লক্ষ টাকা ঋণ করে ঢাকার মহাখালীর একটি জনশক্তি রপ্তানিকারী এজেন্সির মাধ্যমে গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ায় যান। ওই এজেন্সিকেই নগদ আট লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। তারা বলেছিল, রাশিয়ায় ভাল বেতনে হোটেলে চাকরি দেবে। কিন্তু রাশিয়ায় নিয়ে একটি শূকরের খামারে কাজ দেয়। দীর্ঘ সময় ডিউটি করতে হয়। ঠিকমত খাবারও দিত না। জাহাঙ্গীর কাজ ছেড়ে দিতে চাইলে ভাল কাজের কথা বলে একটি কাগজে তাঁর স্বাক্ষর রেখে তাকে গত ১২ এপ্রিল ঢুকিয়ে দেওয়া হয় রুশ সেনাবাহিনীতে। প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় ৯ মে থেকে। ইউক্রেনের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়েই ১৮ মে জাহাঙ্গীর মাইন বিস্ফোরণে মারা যান। তাঁর সাথে মাদারিপুর সদর উপজেলার সুরুজ কাজী নামে এক যুবকও মারা গেছেন। তবে মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে জাহাঙ্গীর স্ত্রীর কাছে ৭৭ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। সেই টাকা ঋণ শোধ করতে খরচ করা হয়েছে।
মা জাকিয়া বেগম বিলাপ করছিলেন আর বলছিলেন, ‘মৃদুল জানাইছে, আমার পোলার লাশটা নাকি যেইহানে মরছে, ওইহানেই পইড়া আছে। আনার মত কোন অবস্থা নাই। আমি আমার জাহাঙ্গীরের লাশ চাই। তোমরা সবাই আমার জাহাঙ্গীরের লাশ আইনা দেও। আর কারও মায়ের বুক যেন খালি না হয়। এইভাবে যেন কেউ রাশিয়ার যুদ্ধে না নামায়।’ এসময় উপস্থিত অন্যান্য মহিলারাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। বাড়িতে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মাশুকা ও সন্তান আমানকে পাওয়া যায়নি। তারা জেলা শহরে প্রবাসী কল্যাণ ব্যুরো অফিসে গিয়েছিলেন।
জাহাঙ্গীরের বড় চাচী রাবেয়া খাতুন বলছিলেন, জাহাঙ্গীরের পরিবারটি খুবই গরিব। চলার মত অবস্থা নেই। এখন এরা পথে বসবে। সবাইকে মিলে সহায়তা করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও ভাল সাহায্য দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। প্রতিবেশি অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মিজানুর রহমান বাবুল জানান, শৈশব থেকে তিনি জাহাঙ্গীরকে দেখে আসছেন। জাহাঙ্গীর খুবই ভাল ছেলে ছিল। এলাকার কারও সাথে কখনও বিরোধ হয়নি। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় একটি শোকের আবহ বিরাজ করছে। তিনিও সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন, যেন জাহাঙ্গীরের অসহায় পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।
উল্লেখ্য, করিমগঞ্জের জাফরাবাদ ইউনিয়নের মাঝিরকোনা গ্রামের রিয়াদ রশিদ (২৮) নামে এক যুবকও গত ২ মে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছিলেন। তাঁর লাশটি হামলায় একেবারে ভষ্মীভূত হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক আব্দুর রশিদ।
‘গার্মেন্টসে কাজ কইরা পড়াইছি এহন আমার সব শেষ হয়া গেল’
62 views
