পুলিশের বিরুদ্ধে বাদীকে আপোষ মীমাংসার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ, কটিয়াদীতে কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বিধবাকে উত্যক্ত ও প্রাণনাশের হুমকি

229 views

# মুহাম্মদ কাইসার হামিদ :-
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ চরপুক্ষিয়া গ্রামে এক অসহায় বিধবা নারীকে কুপ্রস্তাব দেওয়া, মানসিক নির্যাতন ও উত্যক্ত করা এবং সর্বশেষ ধারালো অস্ত্র উঁচিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক চিহ্নিত মাদক সেবনকারি ও মাদক কারবারির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় কটিয়াদী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের ৬ সপ্তাহেও মামলাটি এফআইআর না করে উল্টো মাদকাসক্ত ও মাদক কারবারির পক্ষ নিয়ে পুলিশ ভুক্তভোগীর পরিবার ও বাদীকে চাপ সৃষ্টি করছে অভিযুক্তের সাথে আপোষ মীমাংসা করার জন্য। থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে, ৩ কন্যা সন্তান ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছেন ভুক্তভোগী পরিবারটি। এমন অভিযোগ বাদী ও বাদীর পরিবারের।
ভুক্তভোগী নার্গিস আক্তার (৩৫) কটিয়াদী উপজেলার দক্ষিণ চরপুক্ষিয়া গ্রামের মৃত রিপন মিয়ার স্ত্রী। অভিযুক্ত শাহজাহান (৪২) একই গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন সামুর ছেলে। এলাকায় সে চিহ্নিত মাদক কারবারি ও মাদকসেবী হিসেবে পরিচিত।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তিন কন্যাসন্তানকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন নার্গিস আক্তার। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই তাঁর ওপর কু-দৃষ্টি পড়ে প্রতিবেশী শাহজাহানের। সে বিভিন্ন সময় নার্গিস আক্তারকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। তাঁর এই অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় নার্গিস আক্তারের ওপর চরম ক্ষিপ্ত হয় শাহজাহান।
শুধু তাই নয়, নার্গিস আক্তারের চলাচলের পথে ওৎপেতে থেকে বিরক্ত করা, এমনকি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে টয়লেট ও গোসলখানার আশেপাশে অবস্থান করে অশ্লীল ইঙ্গিত ও কুপ্রস্তাব দেওয়া শুরু করে শাহজাহান। যা ওই নারীর জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। অসহায় এই নারী এর প্রতিবাদ করলে শাহজাহান তাকে ধারালো ছুরি দেখিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এছাড়া প্রায়ই রাতের আঁধারে ঘরের দরজায় এসে জোরপূর্বক দরজা খোলার জন্য চাপ সৃষ্টি করে এবং দরজা না খুললে হত্যার হুমকি ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নারী একাধিকবার এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানালেও কোনো সুরাহা পাননি।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় গত ২৯ এপ্রিল সকালে নার্গিস আক্তার কাজের উদ্দেশ্যে পাশের বাড়ির একটি মুরগির ফার্মে যান। তাঁর অনুপস্থিতিতে শাহজাহান ধারালো ছুরি হাতে তাঁর বাড়িতে গিয়ে চড়াও হয়। নার্গিস আক্তারকে না পেয়ে তাঁর বৃদ্ধা মাকে উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে এবং অভিযোগ করে, মায়ের কারণেই নার্গিস আক্তার তাঁর কথায় রাজি হচ্ছে না। এ সময় বৃদ্ধা মা তাকে গালিগালাজ করতে নিষেধ করলে শাহজাহান আরও ক্ষিপ্ত হয়ে হাতে থাকা ধারালো ছুরি নিয়ে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তেড়ে যায়। বৃদ্ধা মা প্রাণভয়ে দৌড়ে পাশের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে রক্ষা পান। উপস্থিত লোকজন ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন। ওই সময় শাহজাহান প্রকাশ্যে হুমকি দেয়, নার্গিস আক্তার তাঁর কথায় রাজি না হলে মা ও মেয়ে দুজনকে হত্যা করা হবে। এসময় এলাকাবাসী শাহজাহানের হাত থেকে জোরাজোরি করে ধারালো ছুরিটি উদ্ধার করে এবং শাহজাহানকে এই স্থান থেকে চলে যেতে বলে।
এ ঘটনার পর ওইদিন ২৯ এপ্রিল বিকেলেই ভুক্তভোগী নার্গিস আক্তার বাদী হয়ে কটিয়াদী মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ (নম্বর- জ- ৮৪৫/২৬) দাখিল করেন। কিন্তু অভিযোগ দাখিলের দেড় মাস পার হলেও পুলিশ কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়নি।
ভুক্তভোগী নার্গিস আক্তার অভিযোগ করে বলেন, ৮ জুন সোমবার দিবাগত রাতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. আক্তার হোসেন তাদের থানায় ডেকে নেন এবং আসামির পক্ষ অবলম্বন করে আসামির সাথে তাকে আপোষের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। এমনকি শাহজাহানের নিকট থেকে উদ্ধার করা ধারালো ছুরিটি ৯ জুন মঙ্গলবার দুপুর ১২টার মধ্যে থানায় জমা দেওয়ার জন্য বলেন। এর আগে এসআই আক্তার হোসেন বাদীর বাড়িতে গিয়ে বলেন, আমরা আসামিকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠালে কি লাভ হবে? কয়েকদিন পর জেল থেকে জামিনে বাড়ি এসে আবার তোমাকে অত্যাচার করবে। আমরা কি সবসময় তোমাদের পাহাড়া দিতে পারবো? বরং বিষয়টি আপোষ মিমাংসা করে ফেল।
ভুক্তভোগী পরিবারের ধারণা, আসামির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে পুলিশ এই মামলাটি এফআইআর না করে আপোষ করানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
গত ৫ জুন কটিয়াদীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপির উপস্থিতিতে একটি মাদক বিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কটিয়াদী মডেল থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, কোনো মাদক কারবারি পার পাবে না, তাদের সাত হাত পানির নিচ থেকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছিলেন।
তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ওসির সেই হুঙ্কারের সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। একজন চিহ্নিত মাদক কারবারির বিরুদ্ধে অসহায় বিধবা নারী ও তাঁর বৃদ্ধা মায়ের ওপর হামলার প্রকাশ্য অভিযোগ থাকার পরও পুলিশী নিষ্ক্রিয়তা এবং উল্টো আপোষের চাপ দেওয়ার ঘটনা ওসির সেই বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বর্তমানে চরম নিরাপত্তা শঙ্কায় ভুগতে থাকা অসহায় নার্গিস আক্তার ও তাঁর পরিবার ন্যায়বিচারের আশায় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে অভিযোগ তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. আক্তার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ মিথ্যা দাবী করে বলেন, আসামি আর কখনো বাদীনীকে ডিস্টার্ব করবেনা। যদি আসামি বাদীনিকে ডিস্টার্ব করে তাহলে তাকে বেঁধে রাখার জন্য বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে মঙ্গলবার দুপুরে কটিয়াদী মডেল থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বাদী নার্গিস আক্তারের লিখত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আসামি শাহজাহান বাদীনিকে বিয়ে করার জন্য চাচ্ছে। অভিযোগ তদন্তকারী কর্মকর্তার এহেন আচরণের বিষয়টি আমি অবগত নই। সে যদি এ ধরনের আচরণ করে থাকে তাহলে তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হবে। এছাড়া অভিযোগটি তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।