ফলোআপ : কুলিয়ারচরে অপরাধীদের বিচারের দাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল

168 views

# মুহাম্মদ কাইসার হামিদ :-
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর-মানিকদী সংযোগ জিল্লুর রহমান সেতু এলাকায় এবার নবম শ্রেণির এক স্কুল ছাত্রীকে (১৪) অপহরণ ও ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। গত ১৯ এপ্রিল রোববার দুপুরে জিল্লুর রহমান সেতুতে ঘুরতে আসা এক স্কুল ছাত্রীকে তাঁর প্রেমিকের কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নিয়ে দীর্ঘ সময় একটি বাসায় আটকে রেখে ধর্ষণের চেষ্টা করে এক যুবক। ভিকটিম কুলিয়ারচর উপজেলার আগরপুর গোকুল চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী ও পার্শ্ববর্তী বাজিতপুর উপজেলার দক্ষিণ মাছিমপুর গ্রামের এক কৃষকের মেয়ে।
এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হলে বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আসে। পরদিন ২০ এপ্রিল সোমবার বিকালে কুলিয়ারচর থানা পুলিশ ভিকটিমকে তাঁর বাড়ি থেকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। পরে ভিকটিমের ভাইকে বাদী করে ২০ এপ্রিল সোমবার বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটের সময় কুলিয়ারচর থানায় একটি মামলা (নং- ২৭) রুজু করে জনতার হাতে আটককৃত মো. তামিমকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রাতেই কিশোরগঞ্জ জেলা বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করে। অপর দিকে পরদিন মঙ্গলবার সকালে ভিকটিমের ২২ ধারা জবানবন্দি নেওয়ার জন্য তাকেও কিশোরগঞ্জ জেলা বিজ্ঞ আদালতে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় গত ২২ এপ্রিল বুধবার অপরাধীর বিচারের দাবিতে কুলিয়ারচর সরকারি কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে। তারা অভিযুক্ত মো. তামিমসহ সেতু এলাকায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও সেতু এলাকায় বখাটেদের উৎপাত বন্ধ করণসহ স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত রোববার দুপুরের দিকে ওই ছাত্রী তাঁর প্রেমিকের সঙ্গে জিল্লুর রহমান সেতু এলাকায় অবস্থান করছিল। এসময় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে প্রেমিককে মারধর করে তাঁর কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় এক যুবক। পরে ওই ছাত্রীকে জোরপূর্বক একটি নির্জন বাড়িতে নিয়ে যায়। পরে সেখানে তাকে প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা আটকে রেখে যৌন নির্যাতন করা হয়। একই সঙ্গে নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করা হয়, যা পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঘটনার পর ভুক্তভোগীর প্রেমিক স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সহায়তায় উদ্ধার হয়। এরপর খোঁজ খবর নিয়ে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে কুলিয়ারচর পৌর এলাকার চারারবন মহল্লার ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও তাসলিমা বেগম দম্পত্তির ছেলে অভিযুক্ত মো. তামিম (২৫) কে তাদের বাড়ি থেকে আটক করে স্থানীয়রা। আটকের পর তামিম জনতার উপস্থিতে স্বীকার করে ওই স্কুল ছাত্রীকে তাঁর প্রেমিকের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রেখে মোবাইলের ভিডিও অন করে মেয়েটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এসময় মেয়েটি বলে- “ভাই এইসব করোনা” পরে তাকে আমি ছেড়ে দেই এবং মোবাইলের ভিডিও বন্ধ করে দেই। এসময় তামিমের নিকট থেকে ছিনতাইকৃত মোবাইল ফোন ও মেয়েটিকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে তামিমকে কুলিয়ারচর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করে স্থানীয়রা।
এ ব্যাপারে কুলিয়ারচর থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ঘটনার পরদিন খোঁজ খবর নিয়ে ভিকটিমকে উদ্ধার করার পর তাঁর জবানবন্দি নিয়ে কুলিয়ারচর থানায় একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। জনতার হাতে ধৃত অভিযুক্ত আসামি মো. তামিমকে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়া বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে ভিকটিমের ২২ ধারা জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়রা বলছেন, সেতু ও আশপাশের এলাকা দীর্ঘদিন ধরে অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠেছে এবং প্রায় একই কৌশলে একের পর এক ঘটনা ঘটছে।
উল্লেখ্য, গত ৭ ফেব্রুয়ারি একই এলাকায় ঘুরতে আসা এক দম্পতির সাথেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয় এবং পরে তাকে তুলে নেওয়া স্থানেই ছেড়ে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীর বাড়ি ভৈরব এবং তাঁর স্বামীর বাড়ি কটিয়াদীতে বলে জানা গেছে। মানসম্মানের ভয়ে তারা তখন কোনো অভিযোগ করেননি।
স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মিতভাবে এই এলাকায় আসা প্রেমিক-প্রেমিকা ও দম্পতিদের টার্গেট করছে। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে পুরুষ সঙ্গীকে আলাদা করে নারীদের নির্জন স্থানে নিয়ে নির্যাতন করে আসছে। এমন একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসীর মতে, এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ করা হয় না। এর প্রধান কারণ মানসম্মানের ভয় এবং সামাজিকভাবে নির্যাতিত নারীকে হেয়প্রতিপন্ন করার প্রবণতা। অনেক ক্ষেত্রে কিশোরীরা প্রেমিকের সঙ্গে পরিবারকে না জানিয়ে ঘুরতে এসে এসব ঘটনার শিকার হয়। বিষয়টি পরিবার জানলে তারা আরও সমস্যায় পড়বে- এই আশঙ্কায় তারা নীরব থাকে।
স্থানীয়রা জানান, এসব নানাবিধ ভয় ও সামাজিক চাপে ভুক্তভোগীরা কোথাও কোনো অভিযোগ না করে আড়ালে চলে যায়। অনেকেই “প্রাণে বেঁচে ফিরেছি” এই শান্তনা নিয়েই চুপ থাকে। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে এবং একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটার সুযোগ পায়।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, দিনের বেলাতেই এমন ঘটনা ঘটায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সামাজিক ও পারিবারিক কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ না করায় প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অনেকেই বলছেন, ভৈরবের মানিকদী ও কুলিয়ারচর কালীনদীর উপর নির্মিত সেতুটিকে ঘিরে দিন দিন অপরাধ বেড়েই চলেছে। ছিনতাই, মেয়েদের শ্লীলতাহানী এ যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। সেতু এলাকায় একটি অসাধু চক্র গড়ে তুলেছে কফি হাউজ, ফুচকা হাউজ, বিরানী হাউজ নামে বিভিন্ন দোকান পাট। এসব দোকান পাটে কোন বৈধ কাগজপত্র নেই এরা কোন দোকানের ভ্যাট ইনকাম ট্যাক্স দেই না। সারাদিন ব্যাপী পর্দা দিয়ে আড়াল করে পতিতা ব্যবসার মতন ব্যবসাও পরিচালনা করছে। এছাড়াও আশপাশের বেশ কিছু বাড়িঘরেও স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে নিরাপদে অবৈধ কাজে লিপ্ত হচ্ছে। এসব এলাকার প্রধান ব্যবসা ওইসব খারাপ চরিত্রবান ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ঘর ভাড়া দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আয় করা। এর আগেও একবার ভৈরব উপজেলা প্রশাসন ও ভৈরব পুলিশ বিভাগের সদস্যরা ব্রীজ সংলগ্ন এলাকায় অবৈধ এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দাবী আবারও যেন এসব অবৈধ দোকান পাট ব্রীজ সংলগ্ন এলাকা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *