# মোস্তফা কামাল :-
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার প্রসিদ্ধ পান চাষ এলাকা গোবিন্দপুরের পান চাষীরা সিন্ডিকেটের কারণে দরপতনে পুঁজি হারাচ্ছেন। সকল পান চাষীর মুখেই হতাশার সুর। কেউ কেউ ক্ষতির বোঝা টানতে না পেরে জমিতে হাজার হাজার পানগাছ রেখেই মনের ক্ষোভে পানের বরজ ভেঙে ফেলছেন। গতকাল মঙ্গলবার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের মধ্য গোবিন্দপুর ও উত্তর পানান এলাকায় গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা গেছে।
পান চাষীরা বলছেন, হোসেনপুর উপজেলায় প্রায় ৫০০ জন পানচাষী আছেন। এর মধ্যে গোবিন্দপুর ইউনিয়নেই আছেন প্রায় ৪০০ জন। এই এলাকাটি পান চাষের জন্য বেশ উর্বর। এটি একটি লাভজনক অর্থকরি ফসল হবার কারণে যুগ যুগ ধরে এই এলাকায় ব্যাপকভাবে পান চাষ হয়ে আসছে। কিন্তু গত দু’তিন বছর ধরে একটি সিন্ডিকেটের কারণে পান চাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাজারে যে দাম থাকে, তাতে খরচের টাকাও উঠছে না। বরং পুঁজিতে টান পড়েছে।
উত্তর পানান এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বর্ষীয়ান পানচাষী আব্দুল কাদির জমির পান গাছসহ তাঁর পানের বরজ ভেঙে ফেলছেন। তিনি জানান, তিন বছর ধরে ১৮ শতাংশ জমিতে পানচাষ করছেন। সপ্তাহে অন্তত ৪০ বিড়া (১৬০ পাতায় এক বিড়া) পান তুলতে পারতেন। মাসে অন্তত ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। আগে এক বিড়া পান পাইকারি বিক্রি হতো ২০০ টাকায়। এখন নেমে এসেছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়! এভাবে পানচাষ করা যাবে না। এই তিন বছরে তাঁর দুই লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই জমি টিকিয়ে রাখলে কেবল ক্ষতির মাত্রাই বাড়তে থাকবে। যে কারণে তিনি মনের ক্ষোভে বরজ ভেঙে ফেলছেন। এই জমিতে তিনি অন্য ফসলের চাষ করবেন। একই এলাকার পানচাষী আবু সিদ্দিক ৫৩ শতাংশ জমিতে পানচাষ করেছেন। শ্রমিক লাগিয়ে পুরো জমির পান তুলতে খরচ হবে প্রায় ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু বিক্রি করা যাবে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায়। যে কারণে সময় পেরিয়ে গেলেও জমিতেই পান পড়ে আছে।
মধ্য গোবিন্দপুর এলাকার আরেক বর্ষীয়ান পানচাষী শুকুর মামুদ বলেছেন, তিনি ৪১ শতাংশ জমিতে পানচাষ করেছেন। সপ্তাহে অন্তত ৯০ বিড়া পান তোলা যায়। কিন্তু দাম কম থাকায় পান আহরণ করছেন না। পানের বয়স বেড়ে গিয়ে গাছ থেকে ঝরে পড়ছে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া কোন উপায় নেই। একই এলাকার চাষী স্বপন মিয়া ৩৬ শতাংশ জমিতে, শাহজাহান মিয়া ২৭ শতাংশ জমিতে, বাবুল মিয়া ১৮ শতাংশ জমিতে, এরশাদ মিয়া ১০ শতাংশ জমিতে পানচাষ করেছেন। তাঁরাও অন্য চাষীদের মতই ক্ষতির কারণে জমি থেকে পান আহরণ করছেন না। এরকম আরও বহু পানচাষী একইভাবে করুণ অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।
গোবিন্দপুর চৌরাস্তা বাজারে পানের হাট বসে শনিবার, সোমবার, মঙ্গলবার ও শুক্রবার। পানচাষীরা বলেছেন, তাঁরা হাটের দিন জমির পান নিয়ে যান পাইকারদের কাছে বিক্রির জন্য। বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৫-২০ জন পাইকার আসেন পান কিনতে। কিন্তু সেই বাজার কমিটির সভাপতি আব্দুর রশিদের নেতৃত্বে কয়েকজনের একটি সিন্ডিকেট অন্য পাইকারদের পান কিনতে বাধা প্রদান করেন। যে কারণে পানচাষীরা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। তবে আব্দুর রশিদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বাজার তো আর একটা না। চাষীরা তাহলে অন্য হাটেও পান নিয়ে যেতে পারেন।
জেলা খামারবাড়ি সূত্রে জানা গেছে, জেলায় গত ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১৪৫ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে হোসেনপুর উপজেলায় ছিল ৩২ হেক্টর। এখানে লালডিংগি, সাচি, গয়াসুর ও গ্যাচ জাতের পানের আবাদ হয়ে থাকে। তবে চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমের হিসাব এখনও প্রস্তুত করা হয়নি।
চাষীরা অভিযোগ করেছেন, তারা বহু বছর ধরে পানের আবাদ করছেন। কিন্তু পানচাষ ভাল হচ্ছে কিনা, দাম ভাল পাচ্ছেন কিনা, কোন পরামর্শ আছে কিনা, হোসেনপুরের কোন কৃষি কর্মকর্তা দেখতেও আসেন না। তবে হোসেনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ মহসিন এ অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, প্রত্যেক ইউনিয়নে একাধিক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আছেন। তারা সবসময় এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, চাষীরা পানের দামের বিষয়ে কিছু জানাননি। তিনি বলেন, গত মৌসুমে ৩২ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হলেও এবার কমে গেছে। এবার ৩০ হেক্টরের কম জমিতে আবাদ হয়েছে। তিনি মনে করেন, নীচু এলাকা হবার কারণে এবার আবাদ কমে গেছে।
দরপতনে জমিতেই নষ্ট হচ্ছে পান কেউ কেউ বরজ ভেঙে ফেলছেন
42 views
