এক খুনি ঘাগড়া বাজার থেকে মোবাইল সিম কিনেছে, হামলার পরই জাহাঙ্গীরের নম্বরে ফোনে মৃত্যুর খবর জানতে চায়

40 views

# মোস্তফা কামাল :-
বুধবার রাতে মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে (৫৭) তিন ভাড়াটে খুনি কুপিয়ে হত্যা করেছে। খুনিরা তিনদিন আগেই মিঠামইনের ঘাগড়া এলাকায় সাগর নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে এসে ওঠেন। ঘাগড়া বাজার থেকে এক খুনি সাগরের সহায়তায় একটি মোবাইল ফোনের সিমও কিনেছেন। জাহাঙ্গীরের ওপর হামলার পর পরই একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে জাহাঙ্গীরের ফোন নম্বরে ফোন দিয়ে জানতে চায়, জাহাঙ্গীরের আত্মাটা তখনও আছে কী না। এ প্রতিবেদককে এসব কথা জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরের বড়ভাই বিএনপি কর্মী শাহেরীল আলম তপন।
তিনি বলেছেন, মিঠামইন উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়ক মোকাররম হোসেন খোকাসহ আরও কয়েকজন জড়িত আছেন বলে নাম পাওয়া যাচ্ছে। তবে নামগুলো সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হলে পুলিশকে জানাবেন। তিনি জানান, জাহাঙ্গীরের ওপর হামলার পর পরই একটি অচেনা মোবাইল ফোন নম্বর থেকে জাহাঙ্গীরের মোবাইলে ফোন দেওয়া হয়। এসময় সবাই জাহাঙ্গীরকে নিয়ে ব্যস্ত। ফোনটি ধরেন বাসার গৃহপরিচারিকা। ফোন ধরতেই জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘জাহাঙ্গীরের আত্মাটা এখনও যায় নাই?’ আপনি কে বলতেছেন, গৃহপরিচারিকা এই প্রশ্ন করতেই ফোনের সংযোগ কেটে দেয়। তবে ফোন নম্বরটি লিখে রাখা হয়েছে। সেটি পুলিশকে দেওয়া হবে।
শাহেরীল আলম তপন আরও জানান, এখন জানা যাচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের তিনদিন আগেই তিন খুনি ঘাগড়া গ্রামের সাগরের বাড়িতে উঠেছিলেন। ঘাগড়া বাজারের একটি মোবাইল ফোনের দোকানে এক খুনি সাগরকে নিয়ে একটি মোবাইল ফোনের সিম কিনতে গিয়েছিলেন। কিন্তু এনআইডি না থাকায় ব্যবসায়ী সিম বিক্রি করতে রাজি হচ্ছিলেন না। তখন সাগর নিজে সিমটি কেনার ব্যবস্থা করে দেন। সাগর ঢাকায় থাকেন। সেখানে কী করেন, তাও শাহেরীল আলম তপন জানেন না।
হামলার সময় জাহাঙ্গীরের সঙ্গী হাদিস মিয়াসহ এলাকাবাসী চাপাতিসহ বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামের প্রয়াত সুলতানের ছেলে মো. হেলালকে (২৫) হাতেনাতে ধরে ফেলেন। ঘটনার রাতেই করিমগঞ্জের হাওর থেকে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার দুধরাজপুর গ্রামের মো. নূর হোসেনের ছেলে মো. মহিন উদ্দিন (৩৩) ও একই উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামের রহমত উল্লাহ খোকনের ছেলে মো. শাহিন আলম শাকিল (২৭)।
ঘাতক হেলাল কাশিমপুর কারাগারে ছিলেন। তাকে এ কাজটি করার জন্য মিঠামইন উপজেলা ছাত্র দলের আহবায়ক মোকাররম হোসেন খোকা জামিন করিয়েছেন। এসময় খোকার সাথে আরও এক ব্যক্তি ছিলেন, তাকে হেলাল চেনেন না বলে জানান। ধরা পড়ার পর হেলালকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। এরপর একটি ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, হেলালকে স্থানীয়রা জিজ্ঞাসাবাদ করছেন, কার কথায় তিনি এই কাজ করেছেন। না বললে নাড়িভুরি বের করে ফেলা হবে বলে ভয় দেখানো হয়। তখন হেলাল বলেন, ‘পরে কই, মাথাটায় বাড়ি লাগছে। আমি পরে কই ভাই।’ কিন্তু চাপের মুখে হেলাল বলতে থাকেন, ‘খোকা ভাই পাঠাইছে। খোকা ভাইয়ের সাথে আরেকটা লোক আছে। উনারে আমি চিনি না। তারে আমি প্রথম দেখছি। উনি আমারে জামিন করাইছে কাশিমপুর থেকে। কইছে তুই কাজটা কইরা দিবি।’
তিনি কাশিমপুর কারাগারে ছিলেন। দলের অনেকেই মনে করছেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নানা রকম সুযোগসুবিধা এবং আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাÐটি ঘটে থাকতে পারে।
মিঠামইনের ঘাগড়া ইউনিয়নের এক সাবেক চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, এলাকায় ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে, জাহাঙ্গীরের ওপর হামলার সময় হেলাল তাৎক্ষণিকভাবে আটক হলেও মহিন উদ্দিন ও শাকিল কিলিং মিশন সম্পন্ন করে আবার ঘাগড়া গ্রামে গিয়ে সাগরের বাড়িতে রাতে খাওয়াদাওয়া করেছেন। এরপর রাতেই সাগর একটি স্পীডবোট ভাড়া করে মহিন উদ্দিন ও শাকিলকে পালানোর জন্য করিমগঞ্জের বালিখলা ঘাটের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু গভীর রাতে করিমগঞ্জের হাওরেই তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।
ঘটনার পর থেকে ছাত্রদল আহবায়ক খোকার ফেসবুক এবং মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। তিনি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে দেখতেও যাননি, জানাজায়ও অংশ নেননি। বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে আছেন বলে ধারণা করছেন এলাকাবাসী। মোকাররম হোসেন খোকাকে ‘মীরজাফর’ আখ্যা দিয়ে অনেকেই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। ঘাগড়া গ্রামের সাগরকেও এখন আর প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না বলে জানা গেছে।
এদিকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম বলেছেন, প্রকৃত দোষী যেই হোক, দলের পক্ষ থেকে তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। আর মিঠামইন উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়ক মোকাররম হোসেন খোকার নাম যেহেতু উঠেছে, তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতি আহবান জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *