* মিলাদ হোসেন অপু :-
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ফুটবল খেলা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় দুই থানার ওসি ও ১০ জন পুলিশ সদস্যসহ উভয়পক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে দুই পক্ষের সংঘর্ষকারীরা ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অবস্থান নিয়ে স্টেশন মাস্টারের কক্ষ ও টিকিট কাউন্টারসহ কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রেলপথে চলাচলকারী অন্তত ৬টি ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে। ৫ ঘণ্টা পর ভৈরব মেঘনা ব্রীজে আটকে থাকা ঢাকাগামী মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন রাত ১ টা ৪০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাত ৮টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে ও আশপাশের এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রথমে রেলওয়ে থানা পুলিশ ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হলে ভৈরব থানা পুলিশ ও শহর ফাঁড়ি পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা চালায়। তারা ব্যর্থ হলে ভৈরব র্যাব ক্যাম্পের সদস্যরা ও ভৈরব সেনাবাহিনী ক্যাম্পের সদস্যরাসহ উপজেলা নির্বাহী অফিসার কেএম মামুনুর রশীদ ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এএইচএম আজিমুল হক ঘটনাস্থলে এসে দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পৌর শহরের পঞ্চবটি এলাকার যুবকদের সাথে জগন্নাথপুর এলাকার যুবকদের মধ্য ১৫ দিন আগে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার জেরে ৪ জুন বিকেলে ভৈরব স্টেশন এলাকায় জগন্নাথপুর এলাকার সোহেল মিয়ার ছেলে লিয়ামকে মারধর করেন পঞ্চবটি এলাকার লোকজন। পরে মারধরের ঘটনায় জগন্নাথপুর ও পঞ্চবটি এলাকার লোকজন সংঘর্ষে লিপ্ত হন। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের শতাধিক লোক দেশীয় অস্ত্রসহ ইট-পাটকেল ও রেললাইনের পাথর নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। উত্তেজিত সংঘর্ষকারীরা স্টেশনে হামলা চালিয়ে স্টেশন মাস্টারের কক্ষ ও টিকিট কাউন্টারসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে। বৃষ্টিরমতো রেলের পাথর নিক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে পুলিশ সদস্যরাও হামলার শিকার হন।
আহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ভৈরব থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ, এসআই ইমদাদুল কবীর, রেলওয়ে থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাঈদ আহমেদ, এসআই সাইফুল, এসআই জহুরুল ইসলাম, কনস্টেবল মেহেদী হাসান, সুলতান মাহমুদ, মিন্টু মিয়া, মাহমুদুল হাসান ও দাউদ নবী। গুরুতর আহত হয়েছেন এসআই সাইফুল এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্য মুছা। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সংঘর্ষের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রেলপথে ৫ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে ঢাকাগামী দুটি মহানগর এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, এগারসিন্ধুর প্রভাতী, তিতাস কমিউটার এবং কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ভৈরব থানা পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী, আনসার সদস্যরা, ভৈরব র্যাব ক্যাম্প ও ভৈরব সেনাবাহিনী ক্যাম্পের সদস্যরা পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান। তবে সংঘর্ষে জড়িত পক্ষগুলোর ইট-পাটকেলসহ রেললাইনের পাথর বৃষ্টির মতো নিক্ষেপের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়।
ঢাকাগামী মহানগর এক্সপ্রেসের যাত্রী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই আমি স্টেশনে এসে অপেক্ষা করছিলাম। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও হঠাৎ করে সংঘর্ষের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় এবং একপর্যায়ে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে আমরা শত শত যাত্রী স্টেশনের ভেতরে ও প্ল্যাটফর্মে আটকে পড়ি। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় তথ্যের অভাবে, কখন ট্রেন চালু হবে, আদৌ চলবে কি না, সে বিষয়ে কেউই স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেনি। একটি তুচ্ছ ঘটনার কারণে নিরীহ যাত্রীদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ভুক্তভোগী যাত্রী আল আমিন বলেন, “আমি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে স্টেশনে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই দেখি চারদিকে অস্বাভাবিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ইট-পাটকেল ও রেললাইনের পাথর নিক্ষেপ শুরু হয়, সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
কিশোরগঞ্জগামী যাত্রী নাজমা আক্তার বলেন, “আমি আমার দুই সন্তানকে নিয়ে স্টেশনে অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ করেই সংঘর্ষ শুরু হলে চারদিকে ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ছোটাছুটি করতে থাকে, আর ইট-পাটকেলের শব্দে শিশুরা ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে।
বেসরকারি চাকরিজীবী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “অফিসের জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়ার জন্য রওনা দিয়েছিলাম, কিন্তু ভৈরব স্টেশনে এসে পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। সংঘর্ষের কারণে ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।
ঢাকা ফেরত ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান বলেন, “ঢাকায় ব্যবসার জরুরি কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছিলাম। কিন্তু হঠাৎ এই পরিস্থিতিতে পড়ে সবকিছু থেমে যায়।
বয়স্ক যাত্রী আবদুল মালেক বলেন, “আমি অসুস্থ অবস্থায় ডাক্তার দেখানোর জন্য ঢাকায় যাচ্ছিলাম। কিন্তু স্টেশনে এসে দেখি সম্পূর্ণ অচল ও অস্থির পরিস্থিতি।
এদিকে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন ও আশপাশের এলাকায় চলমান অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে মহানগর গোধূলী ট্রেনে আটকে পড়া সাতজন বিদেশগামী যাত্রীকে স্থানীয় ছাত্র ও যুব সমাজের সহযোগিতায় বিকল্প পথে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে ব্যবস্থা করে দেয়।
এ বিষয়ে ছাত্র ও যুব সমাজের পক্ষ থেকে মোবারক হোসেন বলেন, “ঘটনার সময় আমরা জানতে পারি যে সাতজন বিদেশগামী যাত্রী ট্রেনে আটকা পড়ে আছে। তারা যদি সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছাতে না পারেন, তাহলে তাদের বিদেশযাত্রা মিস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পরিস্থিতির জটিলতা বিবেচনা করে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয়ভাবে সমন্বয় করে তাদের নিরাপদে ঢাকা এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করি।
বিদেশগামী যাত্রীদের আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা যখন স্টেশনে আটকে পড়ি, তখন চারদিকে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তা দেখে সত্যিই খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের সবারই নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট ছিল এবং আমরা ভেবেছিলাম যে এই পরিস্থিতির কারণে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বিদেশযাত্রা সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়ে যাবে। ঠিক সেই সময় স্থানীয় ছাত্র ও যুব সমাজ আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়।
ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. ইউছুফ বলেন, “ফুটবল খেলার বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে স্টেশন এলাকায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এতে স্টেশনের বিভিন্ন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সোয়া ৯টা থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় রাত ১টা ৪০ মিনিটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাঈদ আহমেদ বলেন, “ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই বাছাই করে দোষীদের শনাক্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় পঞ্চবটী ও জগন্নাথপুর এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার জানান, রাত ১টা ১০ মিনিটে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ট্রেন চলাচলের উপযোগী ঘোষণা করে। এরপর রাত ১টা ৩০ মিনিটে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এর আগে রাত ৯টা ১৫ মিনিটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। রাত ১টা৪০ মিনিটে মহানগর গোধূলীসহ কয়েকটি ট্রেন স্বল্প বিরতিতে স্টেশন অতিক্রম করে গন্তব্যে চলে যায়। এখন পর্যন্ত বড় কোনো ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি, বিস্তারিত পরে জানা যাবে।
ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, “ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে জগন্নাথপুর ও পঞ্চবটি গ্রামের মধ্যে প্রথমে সামান্য সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে দুই পক্ষের লোকজন আবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তারা ভৈরব রেলস্টেশন ও রেললাইনে চলে আসে। সেখানে থাকা পাথর নিক্ষেপ করে উভয় পক্ষ একে অপরকে আক্রমণ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার হন এবং কয়েকজন আহত হন, যার মধ্যে একজন পুলিশ সদস্যের পা ভেঙে যায়। পাশাপাশি অন্যান্য সদস্যরাও আহত হন।
তিনি বলেন, দফায় দফায় চেষ্টা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় এবং ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। এরপর থেকে রেললাইন ও স্টেশনে অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে নির্বিঘ্নে ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করা যায়।
এ ঘটনায় জড়িত দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে রেলওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী অফিসার কেএম মামুনুর রশীদ বলেন, “দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের কারণে দীর্ঘ সময় ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এ ঘটনায় আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আহত হয়েছেন, পাশাপাশি সাংবাদিকরাও আহত হয়েছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। এ ধরনের ঘটনায় অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, কারা এই ঘটনার সূত্রপাত করেছে, কারা সংঘর্ষে জড়িত ছিল তাদের সবাইকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। ঘটনাস্থলে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় জড়িতদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। যারা এ ধরনের ন্যক্কারজনক ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে দুই গ্রামের সংঘর্ষ, ৬ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক, দুই থানার ওসি ও ১২ জন পুলিশ সদস্যসহ অর্ধশতাধিক আহত
4 views
